পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে এই মুহূর্তে শীত যেন পুরো শক্তি নিয়ে হাজির। কোচবিহার থেকে কাকদ্বীপ—সব জায়গাতেই হাড়কাঁপানো ঠান্ডা। প্রতিদিনই পারদ নামছে নতুন নতুন রেকর্ড গড়ে। আলিপুর আবহাওয়া দফতরের তথ্য বলছে, মঙ্গলবার কলকাতা চলতি মরসুমের শীতলতম দিনের সাক্ষী থাকল। শহরবাসীর কাছে এই শীত শুধু অনুভূতির নয়, সংখ্যার দিক থেকেও নজিরবিহীন।
কলকাতার তাপমাত্রা: কতটা নামল পারদ?
সোমবার কলকাতার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১৩.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মঙ্গলবার তা আরও নেমে দাঁড়ায় ১২.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। এই তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ১.২ ডিগ্রি কম। শুধু রাত নয়, দিনের বেলাতেও ঠান্ডার দাপট স্পষ্ট। মঙ্গলবার শহরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ১৮.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৭ ডিগ্রি কম। ডিসেম্বর মাসে এমন কনকনে ঠান্ডা বহু বছর ধরে দেখেননি কলকাতার মানুষ।
দক্ষিণবঙ্গ জুড়ে শৈত্যপ্রবাহের দাপট
কলকাতা একা নয়, দক্ষিণবঙ্গের প্রায় সব জেলাতেই শীতের প্রকোপ তীব্র। রবিবার রাতে পুরুলিয়ায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমেছিল ৭.২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, যা দক্ষিণবঙ্গের মধ্যে সবচেয়ে কম। শ্রীনিকেতনে তাপমাত্রা ছিল ৭.৩ ডিগ্রি, বর্ধমানে ৯ ডিগ্রি, আসানসোলে ৯.১ ডিগ্রি। উপকূলীয় দিঘাতেও ঠান্ডা কম নয়, সেখানে পারদ নেমেছে ১১.২ ডিগ্রিতে। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দিচ্ছে, শীত এবার পুরো দক্ষিণবঙ্গকে গ্রাস করেছে।
উত্তরবঙ্গে আরও কড়া শীত
উত্তরবঙ্গে ছবিটা আরও কঠিন। শৈলশহর দার্জিলিঙে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমেছে ৪.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। কালিম্পঙে ১০ ডিগ্রি এবং কোচবিহারে ১৩.৬ ডিগ্রি রেকর্ড করা হয়েছে। উত্তর দিনাজপুর, কোচবিহার এবং দার্জিলিং—এই জেলাগুলিতে ঠান্ডার সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে ঘন কুয়াশা। বিশেষ করে সকালের দিকে পরিস্থিতি বেশ বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।
আগামী দিনের আবহাওয়া: ঠান্ডা কি আরও বাড়বে?
আলিপুর আবহাওয়া দফতর জানাচ্ছে, কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলিতে আগামী দু’দিন রাতের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা মোটের উপর একই রকম থাকবে। অর্থাৎ, শীতের এই কনকনানি আপাতত কাটছে না। তার পর ধীরে ধীরে তাপমাত্রা ২ থেকে ৩ ডিগ্রি পর্যন্ত বাড়তে পারে। তবে ইংরেজি নতুন বছরের আগে দক্ষিণবঙ্গে শীত কমার কোনও স্পষ্ট পূর্বাভাস নেই। তাই শীতের পোশাক এখনই তুলে রাখার সময় আসেনি।
আকাশের অবস্থা ও কুয়াশার সতর্কতা
মঙ্গলবার কলকাতার আকাশ মূলত পরিষ্কার এবং মেঘমুক্ত থাকবে। তবে ভোরের দিকে শহরের কিছু অংশে হালকা কুয়াশা দেখা যেতে পারে। দক্ষিণবঙ্গ জুড়ে আবহাওয়া শুষ্ক থাকবে বলেই জানিয়েছে হাওয়া অফিস। হালকা থেকে মাঝারি কুয়াশার সতর্কতা জারি করা হয়েছে প্রায় সব জেলাতেই। এর ফলে দৃশ্যমানতা কমে ৯৯৯ মিটার থেকে ২০০ মিটার পর্যন্ত নেমে আসতে পারে, যা যান চলাচলের ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করতে পারে।
উত্তরবঙ্গে ঘন কুয়াশার বিশেষ সতর্কতা
আলিপুর আবহাওয়া দফতর উত্তরবঙ্গের জন্য আলাদা করে সতর্কবার্তা জারি করেছে। দার্জিলিং, কোচবিহার এবং উত্তর দিনাজপুরে মঙ্গলবার ঘন কুয়াশা থাকবে। দৃশ্যমানতা অনেক জায়গায় ১৯৯ মিটার থেকে নেমে ৫০ মিটারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। কোচবিহারের কিছু এলাকায় বিকেলের দিকেও কুয়াশার কারণে দৃশ্যমানতা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসছে। ফলে সড়ক ও রেলপথে চলাচলের সময় বিশেষ সতর্কতা জরুরি।
বৃষ্টি ও তুষারপাতের সম্ভাবনা
শীতের সঙ্গে সঙ্গে উত্তরবঙ্গে আবার ভিন্ন ছবি। আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বুধবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত দার্জিলিঙে হালকা বৃষ্টি হতে পারে। পাশাপাশি উঁচু পার্বত্য এলাকায় তুষারপাতের সম্ভাবনাও রয়েছে। এই বৃষ্টি ও তুষারপাতের ফলে পাহাড়ি অঞ্চলে ঠান্ডা আরও বাড়তে পারে এবং পর্যটকদের জন্য পরিস্থিতি কিছুটা চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠতে পারে।
শীতে সাধারণ মানুষের কী করণীয়?
এই তীব্র শীতে বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের বাড়তি যত্ন প্রয়োজন। ভোর ও রাতের দিকে অপ্রয়োজনে বাইরে না বেরোনো ভালো। গরম পোশাক ব্যবহার, পর্যাপ্ত উষ্ণ খাবার এবং জল পান করা জরুরি। কুয়াশার সময় গাড়ি চালালে হেডলাইট ও ফগ লাইট ব্যবহার করা উচিত। শীতজনিত অসুস্থতা এড়াতে সচেতন থাকাই এখন সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।
উপসংহার
সব মিলিয়ে বলা যায়, চলতি মরসুমে শীত তার চরম রূপ দেখাচ্ছে। কলকাতা থেকে শুরু করে উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গ—সব জায়গাতেই ঠান্ডা মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করছে। আলিপুর আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই কনকনে শীত আরও কিছুদিন বজায় থাকবে। তাই প্রস্তুত থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ। শীতের এই রুক্ষ রূপের মাঝেই নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর জন্য এখন থেকেই সতর্কতা ও সচেতনতা জরুরি।


