ভারতের একাংশ এখন কার্যত কাঁপছে অতি প্রবল শুকনো ঠান্ডায়। এমন ঠান্ডা, যা শুধু শরীর নয়, পুরো স্বাভাবিক জীবনকেই থামিয়ে দিচ্ছে। সকাল হলেই প্রয়োজন ছাড়া কেউ আর ঘর থেকে বেরোতে চাইছেন না। রাস্তায় পা দিলেই বিপদের আশঙ্কা। কোথাও জমে যাচ্ছে জলের পাইপ, কোথাও আবার বরফে ঢেকে যাচ্ছে পুকুর, ঝিল, রাস্তা। এই ভয়াবহ শীতের দাপট সবচেয়ে বেশি টের পাওয়া যাচ্ছে ভারতের উত্তর ও পশ্চিম অংশে, বিশেষ করে কাশ্মীর উপত্যকায়।
উত্তর ও পশ্চিম ভারতে ঠান্ডার চরম রূপ
কলকাতা ও দক্ষিণবঙ্গে শীত কিছুটা নরম হলেও দেশের অন্য প্রান্তে ছবিটা একেবারেই আলাদা। উত্তর ভারত এবং পশ্চিম ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকায় ঠান্ডা ক্রমশ ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে। রাতের তাপমাত্রা নামছে হিমাঙ্কের কাছাকাছি। কোথাও কোথাও তো মাইনাসের ঘরেও ঢুকে পড়ছে পারদ। এই ঠান্ডা শুধু সহ্য করার বিষয় নয়, দৈনন্দিন কাজকর্ম চালানোই কঠিন হয়ে পড়ছে।
কাশ্মীরে শুরু চিল্লাই কলন, শীতের সবচেয়ে কঠিন সময়
কাশ্মীরে এখন চলছে ‘চিল্লাই কলন’। স্থানীয় ভাষায় এই নাম শুনলেই মানুষ বুঝে যান, সামনে আসছে শীতের সবচেয়ে ভয়াবহ সময়। বছরে টানা ৪০ দিন ধরে এই পর্ব চলে। এই সময় কাশ্মীর উপত্যকা ঢেকে যায় তীব্র ঠান্ডার চাদরে। বহু বছরের অভিজ্ঞতায় স্থানীয়রা জানেন, চিল্লাই কলন মানেই বরফ, জমাট রাস্তা আর থমকে যাওয়া স্বাভাবিক জীবন।
এবার শীত আরও ভয়ংকর কেন?
এ বছর কাশ্মীরে ঠান্ডার চরিত্র একটু আলাদা। এখানে চলছে প্রবল শুকনো ঠান্ডা। সাধারণত শীতকালে পশ্চিমী ঝঞ্ঝা সক্রিয় থাকলে হালকা বৃষ্টি বা তুষারপাত হয়। তাতে বাতাসে কিছুটা আর্দ্রতা থাকে। ফলে ঠান্ডা থাকলেও তা এতটা শুকনো হয় না। কিন্তু এবছর পশ্চিমী ঝঞ্ঝার প্রভাব প্রায় নেই বললেই চলে। তার ফলেই এই অস্বাভাবিক শুকনো ঠান্ডা।
এই শুকনো ঠান্ডা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে কল খুললেই জল পাওয়া যাচ্ছে না। জলের পাইপের ভেতর জমে গেছে বরফ। অনেক এলাকায় দিনের পর দিন মানুষ জল পাচ্ছেন না। পুকুর, ঝিল, ছোট জলাশয় পুরোপুরি বরফে ঢেকে গেছে।
ডাল লেকেও বরফের চাদর
কাশ্মীরের প্রাণকেন্দ্র ডাল লেক। পর্যটকদের কাছে যেমন জনপ্রিয়, স্থানীয়দের কাছেও তেমনই গুরুত্বপূর্ণ। এবার ডাল লেকের বড় অংশই বরফে জমে গেছে। যদিও এখনও কিছু অংশে জল রয়েছে, কিন্তু দৃশ্যটা নজিরবিহীন। শিকারাগুলো এক জায়গায় আটকে রয়েছে। পর্যটন কার্যত বন্ধ। এই দৃশ্য কাশ্মীরের শীতের ভয়াবহতার কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে।
সকাল হলেই পিচ্ছিল রাস্তা, গৃহবন্দি মানুষ
এই শুকনো ঠান্ডার আরেকটা বড় সমস্যা হলো পিচ্ছিল রাস্তা। রাতের ঠান্ডায় রাস্তায় জমে যাচ্ছে বরফের আস্তরণ। সকাল হলেই তা আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। গাড়ির চাকা হড়কে যাচ্ছে। মানুষ হাঁটতে গেলে পা পিছলে পড়ে যাচ্ছেন। তাই ঠান্ডার জন্য নয়, বরং দুর্ঘটনার ভয়ে সকালবেলা কেউ ঘর থেকে বেরোতে সাহস পাচ্ছেন না।
অনেক এলাকায় মানুষ কার্যত গৃহবন্দি। স্কুল, অফিস, দোকান—সবকিছুতেই প্রভাব পড়ছে। জীবনের গতি যেন হঠাৎ করেই থেমে গেছে।
শ্রীনগরে তাপমাত্রা মাইনাস ৫ ডিগ্রি
শ্রীনগরের তাপমাত্রা নেমে এসেছে মাইনাস ৫ ডিগ্রির কাছাকাছি। রাতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। এই তাপমাত্রায় সাধারণ মানুষের পক্ষে বাইরে থাকা প্রায় অসম্ভব। হাত-পা জমে যাচ্ছে। মোটা পোশাকেও ঠান্ডা ঢুকে পড়ছে। যারা খোলা জায়গায় কাজ করেন, তাঁদের কষ্টের সীমা নেই।
কেন এতটা শুকনো ঠান্ডা?
সাধারণভাবে কাশ্মীরের শীতে পশ্চিমী ঝঞ্ঝা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। এই ঝঞ্ঝা থাকলে মাঝে মাঝে তুষারপাত বা বৃষ্টি হয়। তাতে তাপমাত্রা কমলেও পরিবেশে আর্দ্রতা থাকে। কিন্তু এবছর সেই ঝঞ্ঝা কার্যত অনুপস্থিত। ফলস্বরূপ বাতাস পুরোপুরি শুষ্ক। এই শুষ্ক বাতাস শরীরের তাপ আরও দ্রুত কেড়ে নেয়। তাই ঠান্ডা অনেক বেশি তীব্র মনে হচ্ছে।
আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাসে সামান্য আশার আলো
আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, আগামী ২ থেকে ৪ দিনের মধ্যে একটি দুর্বল পশ্চিমী ঝঞ্ঝা কাশ্মীরে ঢুকতে পারে। যদি তা হয়, তাহলে হালকা বৃষ্টি বা তুষারপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। এতে পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে। ঠান্ডা পুরোপুরি কমবে না, তবে তার চরিত্র বদলাতে পারে। শুকনো ঠান্ডার বদলে কিছুটা আর্দ্র ঠান্ডা অনুভূত হবে।
সাধারণ মানুষের জীবনে প্রভাব
এই প্রবল শীত সাধারণ মানুষের জীবনে বড় প্রভাব ফেলেছে। জল সংকট তৈরি হয়েছে। যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে। কাজকর্ম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বয়স্ক মানুষ ও শিশুদের জন্য পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ। অনেকেই আগুন জ্বালিয়ে বা হিটার ব্যবহার করে রাত কাটাচ্ছেন। তবুও ঠান্ডার হাত থেকে পুরোপুরি রেহাই মিলছে না।
সামনে কী অপেক্ষা করছে?
চিল্লাই কলন এখনও শেষ হয়নি। সামনে আরও কয়েক সপ্তাহ এই ঠান্ডা থাকতে পারে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, পশ্চিমী ঝঞ্ঝা নিয়মিত না ফিরলে শুকনো ঠান্ডা আরও কয়েকদিন চলবে। তাই মানুষকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। অপ্রয়োজনে বাইরে না বেরোনো, জল জমে যাওয়ার সমস্যা মাথায় রেখে আগেভাগে ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।


