বাংলাদেশে এখন বসন্তকাল। ক্যালেন্ডারে বসন্ত হলেও দেশের বিভিন্ন জায়গায় আকাশের চেহারা দেখে অনেকেরই মনে হচ্ছে যেন বর্ষার আগাম আভাস। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে গত কয়েকদিন ধরে ধূসর মেঘে ঢেকে যাচ্ছে আকাশ, মাঝেমধ্যে বৃষ্টিও হচ্ছে। সামনে ঈদুল ফিতর, তাই স্বাভাবিকভাবেই অনেকের মনে প্রশ্ন—ঈদের আগে বা ঈদের দিন কি ঝড়-বৃষ্টি হতে পারে?
আবহাওয়া অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক পূর্বাভাস বলছে, ঈদের আগে কয়েকদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্ষিপ্তভাবে বৃষ্টি হতে পারে। তবে এটি দীর্ঘ সময়ের টানা বৃষ্টি নয়, বরং স্বল্প সময়ের বজ্রসহ বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
ঈদের আগে বৃষ্টির সম্ভাবনা কেন বাড়ছে
মার্চ মাস বাংলাদেশে মৌসুমি পরিবর্তনের সময়। শীত প্রায় শেষ হয়ে যায় এবং ধীরে ধীরে গরম বাড়তে শুরু করে। এই সময় আবহাওয়ার ভেতরে নানা ধরনের পরিবর্তন ঘটে। বিশেষ করে পশ্চিমা লঘুচাপ এবং সমুদ্রের দিক থেকে আসা আর্দ্র বাতাস একসাথে মিললে আকাশে মেঘ জমে এবং বৃষ্টি হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়।
আবহাওয়াবিদদের মতে, বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার অঞ্চলের তাপীয় লঘুচাপ এবং বঙ্গোপসাগর থেকে আসা বাতাসের কারণে এই বৃষ্টিপাতের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এই দুই ধরনের বাতাস যখন একসাথে কাজ করে, তখন হঠাৎ দমকা হাওয়া, বজ্রপাত এবং স্বল্প সময়ের বৃষ্টি হতে পারে।
ঈদকে ঘিরে মানুষের প্রস্তুতি
ঈদ মানেই আনন্দ, ব্যস্ততা এবং বাড়ি ফেরার উচ্ছ্বাস। এখন দেশের প্রায় সব জায়গাতেই ঈদের প্রস্তুতি চলছে। কেউ ব্যস্ত কেনাকাটায়, কেউ আবার পরিবারের সাথে ঈদের সময় কাটানোর পরিকল্পনা করছে।
বিশেষ করে যারা চাকরি বা পড়াশোনার কারণে শহরে থাকেন, তারা ঈদের ছুটিতে গ্রামে ফিরে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করেন। সরকারও এবার সেই সুযোগকে আরও সহজ করতে বাড়তি ছুটি ঘোষণা করেছে।
শবে কদর এবং ঈদুল ফিতরের ছুটি মিলিয়ে এবার টানা সাত দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে অনেকেই আগেভাগেই বাড়ি যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন। কেউ কেউ আবার ঈদের কয়েকদিন আগে থেকেই যাত্রা শুরু করতে চান যাতে ভিড় এড়ানো যায়।
বৃষ্টি হলে ঈদযাত্রায় কী প্রভাব পড়তে পারে
ঈদের আগে যদি ঝড়-বৃষ্টি শুরু হয়, তাহলে মানুষের যাতায়াতে কিছুটা সমস্যা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে দূরের পথে যারা বাস, ট্রেন বা লঞ্চে ভ্রমণ করবেন, তাদের যাত্রা কিছুটা ধীর হতে পারে।
ধরুন কেউ ঢাকা থেকে খুলনা বা যশোরের দিকে যাচ্ছেন। যদি মাঝপথে বজ্রসহ বৃষ্টি শুরু হয়, তাহলে যানবাহনের গতি কমে যায়। আবার অনেক সময় যানজটও বাড়ে। ফলে যাত্রা কিছুটা সময়সাপেক্ষ হয়ে যেতে পারে।
তবে আবহাওয়া অধিদপ্তরের মতে, এই বৃষ্টি দীর্ঘ সময় ধরে চলবে না। সাধারণত আধা ঘণ্টা বা এক ঘণ্টার মধ্যে শেষ হয়ে যেতে পারে।
কোন দিনগুলোতে বৃষ্টির সম্ভাবনা বেশি
আবহাওয়াবিদদের মতে, ঈদের আগে বিশেষ করে ১৬ ও ১৭ মার্চ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টির সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি থাকতে পারে।
এই সময়টাতে অনেক মানুষই ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার জন্য রওনা দেবেন। তাই কিছু জায়গায় সাময়িক বৃষ্টির কারণে তাদের যাত্রায় সামান্য বিঘ্ন ঘটতে পারে।
তবে আশার কথা হলো, এই সময়ের পর বৃষ্টিপাত কিছুটা কমে যেতে পারে। যদিও পুরোপুরি বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যাবে এমনটা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
ঈদের দিন কি বৃষ্টি হতে পারে?
ঈদের দিন দেশের কিছু জায়গায় হালকা বা স্বল্প সময়ের বৃষ্টি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সেটি দীর্ঘ সময়ের নয়।
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, মার্চ মাসে সাধারণত স্থানীয়ভাবে তৈরি হওয়া মেঘ থেকে স্বল্প সময়ের বজ্রসহ বৃষ্টি হয়। তাই এক জায়গায় বৃষ্টি হলেও অন্য জায়গায় আকাশ পরিষ্কার থাকতে পারে।
এই কারণে আগে থেকে নিশ্চিত করে বলা কঠিন ঠিক কোন এলাকায় বৃষ্টি হবে।
কালবৈশাখীর সম্ভাবনা আছে কি?
মার্চ, এপ্রিল ও মে মাস বাংলাদেশে কালবৈশাখীর মৌসুম হিসেবে পরিচিত। এই সময় হঠাৎ করে ঝড়, দমকা হাওয়া এবং বজ্রপাত হতে পারে।
যদিও এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কালবৈশাখী ঝড় দেখা যায়নি, তবে আবহাওয়াবিদরা বলছেন সামনে কয়েকদিনের মধ্যে কোথাও কোথাও বিক্ষিপ্তভাবে এমন ঝড় হতে পারে।
তবে বাতাসের গতি খুব বেশি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। সাধারণত ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার বেগে বাতাস বইতে পারে। কোথাও কোথাও বজ্রপাত বা বিদ্যুৎ চমকানোর ঘটনাও ঘটতে পারে।
ঈদের সময় তাপমাত্রা কেমন থাকবে
অনেকেরই ভয় থাকে ঈদের সময় প্রচণ্ড গরম পড়বে কি না। তবে আবহাওয়া অফিস বলছে আপাতত তাপমাত্রা খুব বেশি বাড়ার সম্ভাবনা নেই।
ঈদের সময় দেশের বেশিরভাগ এলাকায় তাপমাত্রা ২৮ থেকে ৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকতে পারে। অর্থাৎ খুব বেশি গরমও নয়, আবার ঠাণ্ডাও নয়—মোটামুটি সহনীয় আবহাওয়া থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
তবে মার্চের শেষ দিকে দেশের পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে এক থেকে দুইটি মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ দেখা দিতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
বর্তমান আবহাওয়া পরিস্থিতি
আজ শুক্রবার সকাল থেকেই ঢাকার আকাশ অনেকটা মেঘলা। সূর্যের তেজ কম, বাতাসে কিছুটা ঠাণ্ডা ভাবও অনুভূত হচ্ছে।
সকাল ৯টার আবহাওয়া পূর্বাভাস অনুযায়ী, দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে বর্তমানে মৌসুমের স্বাভাবিক লঘুচাপ অবস্থান করছে। এর প্রভাবেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মেঘ তৈরি হচ্ছে এবং বৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
আগামী ২৪ ঘণ্টার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে—ঢাকা, রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের কিছু জায়গায় এবং খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রামের দুই–এক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়া ও বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে।
আগামী কয়েকদিনের আবহাওয়া প্রবণতা
১৪ মার্চ থেকে ১৭ মার্চ পর্যন্ত দেশের প্রায় সব বিভাগেই কোথাও না কোথাও বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এটি একসাথে পুরো দেশে হবে না। বরং বিভিন্ন অঞ্চলে আলাদা আলাদাভাবে স্বল্প সময়ের বৃষ্টি হতে পারে।
এটাই মার্চ মাসের স্বাভাবিক আবহাওয়া ধারা। এই সময় আকাশ কখনো পরিষ্কার থাকে, আবার হঠাৎ করেই মেঘ জমে বৃষ্টি হয়ে যায়।
ঈদযাত্রায় কীভাবে প্রস্তুত থাকবেন
ঈদের সময় আবহাওয়া পুরোপুরি নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে সাময়িক বৃষ্টির সম্ভাবনা মাথায় রেখে যাত্রার পরিকল্পনা করাই ভালো।
যদি দূরের পথে যেতে হয়, তাহলে সঙ্গে ছাতা বা রেইনকোট রাখা ভালো। কারণ হঠাৎ করে আধা ঘণ্টার বৃষ্টি হলেও তা অনেক সময় ভোগান্তি তৈরি করতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ঈদের আগে কিছু জায়গায় বৃষ্টি হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাই সামান্য সতর্কতা রাখলেই ঈদযাত্রা এবং ঈদের আনন্দ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নির্বিঘ্নেই উপভোগ করা সম্ভব।


