মকর সংক্রান্তির আগেই যেন শীত তার বিদায় ঘণ্টা বাজাতে শুরু করেছে। কয়েকদিন ধরে যে কনকনে ঠান্ডা অনুভূত হচ্ছিল দক্ষিণবঙ্গ জুড়ে, তার তীব্রতা এবার ধীরে ধীরে কমতে চলেছে। আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস বলছে, সপ্তাহান্ত থেকেই তাপমাত্রা বাড়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে। বিশেষ করে রবিবারের পর থেকেই শীতের জাঁকুনি অনেকটাই কমে যাবে বলে মনে করছেন আবহাওয়াবিদরা।
পশ্চিমী ঝঞ্ঝার প্রভাবে বদলাচ্ছে আবহাওয়া
এই আবহাওয়ার পরিবর্তনের মূল কারণ উত্তর-পশ্চিম ভারতে অবস্থান করা পশ্চিমী ঝঞ্ঝা। ইতিমধ্যেই একটি পশ্চিমী ঝঞ্ঝা সক্রিয় রয়েছে, তার উপর আবার ১৬ জানুয়ারি, শুক্রবার নতুন করে আরও একটি পশ্চিমী ঝঞ্ঝা ঢুকছে উত্তর ভারতে। এর ফলে উত্তুরে হাওয়ার গতি অনেকটাই কমে যাবে। সাধারণত এই উত্তুরে হাওয়া বাংলায় শীত টেনে আনে। কিন্তু হাওয়ার গতি বাধাপ্রাপ্ত হলে স্বাভাবিকভাবেই তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করে।
আবহাওয়া দপ্তরের মতে, আপাতত সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা স্বাভাবিকের নিচেই রয়েছে। তাই পুরোপুরি শীত এখনই বিদায় নিচ্ছে না। তবে এই পরিস্থিতি বেশিদিন থাকবে না।
রবিবার পর্যন্ত শীত, তারপরেই উষ্ণতার ছোঁয়া
আলিপুর আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, রবিবার পর্যন্ত দক্ষিণবঙ্গে শীতের আমেজ বজায় থাকবে। কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ঘোরাফেরা করবে ১২ থেকে ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে। সকালে আর রাতে ঠান্ডা লাগলেও দিনের বেলায় রোদের দাপটে শীতের তীব্রতা কিছুটা কম অনুভূত হবে।
পশ্চিমের জেলাগুলিতে পরিস্থিতি একটু আলাদা। পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদিনীপুরের মতো জেলাগুলিতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৭ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকতে পারে। ফলে সেখানে শীতের অনুভূতি তুলনামূলক বেশি থাকবে।
আগামী সপ্তাহে বাড়বে ৩ ডিগ্রি পর্যন্ত তাপমাত্রা
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসতে চলেছে আগামী সপ্তাহে। আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, সোমবার থেকে বুধবারের মধ্যে দক্ষিণবঙ্গের তাপমাত্রা প্রায় ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে। অর্থাৎ সকালের ঠান্ডা থাকলেও দিনের বেলায় শীতের জোর অনেকটাই কমে যাবে।
এই সময়টাকেই মূলত শীতের বিদায়ের শুরু বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে। সংক্রান্তির পর থেকেই ধীরে ধীরে বসন্তের ছোঁয়া টের পাওয়া যাবে বলেই মত আবহাওয়াবিদদের।
কুয়াশার দাপট বাড়বে দক্ষিণবঙ্গে
তাপমাত্রা বাড়লেও আরেকটি সমস্যা বাড়তে চলেছে, আর তা হলো কুয়াশা। শুক্রবার থেকেই দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় ঘন কুয়াশার পূর্বাভাস দিয়েছে হাওয়া অফিস। বিশেষ করে নদিয়া, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান, হুগলি এবং উত্তর চব্বিশ পরগনায় কুয়াশার ঘনঘটা বাড়বে।
ভোরের দিকে কুয়াশার কারণে দৃশ্যমানতা অনেক জায়গায় কমে যেতে পারে। ফলে জাতীয় সড়ক ও রেলপথে চলাচলের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কলকাতার আবহাওয়া কেমন থাকবে
কলকাতায় বৃহস্পতিবার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১৩.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গতকাল দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল প্রায় ২৩ ডিগ্রি। আগামী তিন থেকে চার দিন শহরে শীতের মেজাজ বজায় থাকলেও কুয়াশার প্রভাব বাড়বে।
শুক্রবার, শনিবার এবং রবিবার সকালের দিকে ঘন কুয়াশা দেখা যেতে পারে। তবে আকাশ মূলত পরিষ্কার থাকবে এবং আবহাওয়া শুষ্কই থাকবে। বৃষ্টির কোনও সম্ভাবনা নেই বলে স্পষ্ট জানিয়েছে আবহাওয়া দপ্তর।
উত্তরবঙ্গে শীত এখনও অনড়
দক্ষিণবঙ্গে শীত বিদায়ের পথে থাকলেও উত্তরবঙ্গে এখনও ঠান্ডার দাপট কমছে না। আগামী পাঁচ দিন উত্তরবঙ্গের সর্বনিম্ন তাপমাত্রায় বড় কোনও পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। আবহাওয়া প্রায় একই রকম থাকবে।
দার্জিলিংয়ের পার্বত্য এলাকায় তাপমাত্রা দুই থেকে চার ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকতে পারে। পাহাড়ে শীতের অনুভূতি থাকবে বেশ কড়া। অন্যদিকে জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, মালদহ, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুরের মতো জেলাগুলিতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৮ থেকে ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ঘোরাফেরা করবে।
উত্তরবঙ্গেও ঘন কুয়াশার সতর্কতা
দক্ষিণবঙ্গের পাশাপাশি উত্তরবঙ্গেও কুয়াশা বড় চিন্তার কারণ হয়ে উঠছে। হাওয়া অফিস জানিয়েছে, শুক্রবার থেকে রবিবারের মধ্যে উত্তরবঙ্গের একাধিক জেলায় ঘন কুয়াশা পড়তে পারে। কোথাও কোথাও দৃশ্যমানতা নেমে আসতে পারে মাত্র ৫০ মিটারের কাছাকাছি।
বিশেষ করে দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, মালদহ, উত্তর দিনাজপুর এবং দক্ষিণ দিনাজপুর জেলায় ঘন কুয়াশার সতর্কতা জারি করা হয়েছে। পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
শীতের বিদায়, তবে সাবধানতা জরুরি
সব মিলিয়ে বলা যায়, মকর সংক্রান্তির সময় থেকেই শীত ধীরে ধীরে বিদায় নিতে শুরু করবে। তাপমাত্রা বাড়বে, দিনের বেলায় ঠান্ডার অনুভূতি কমবে। কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গে কুয়াশার সমস্যা বাড়বে, যা দৈনন্দিন জীবন ও যাতায়াতে প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই শীতের শেষ লগ্নে এসেও হালকা গরম পোশাক সঙ্গে রাখা, ভোরের দিকে বাইরে বের হলে সতর্ক থাকা এবং যানবাহন চালানোর সময় সাবধানতা অবলম্বন করাই বুদ্ধিমানের কাজ। শীত বিদায় নিলেও আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনা যে এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি, তা বলাই বাহুল্য।


