দিল্লির একেবারে কাছেই এমন এক শহর, যেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ অফিস করতে যাতায়াত করেন। আধুনিক অট্টালিকা, ঝাঁ চকচকে রাস্তা আর কর্পোরেট সংস্কৃতির জন্য পরিচিত সেই শহরই এখন ঢেকে গেছে বরফের চাদরে। কথা হচ্ছে গুরুগ্রামকে নিয়ে। হরিয়ানার এই স্যাটেলাইট সিটি এবার এমন ঠান্ডার মুখোমুখি হয়েছে, যা গত ৯০ বছরেও দেখেনি শহরবাসী।
দিল্লির পাশেই অথচ ছবি একেবারে আলাদা
দিল্লি থেকে গুরুগ্রামের দূরত্ব বড়জোর এক ঘণ্টা। মেট্রো, এক্সপ্রেসওয়ে আর আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে বহু মানুষ প্রতিদিন দিল্লি থেকে গুরুগ্রামে অফিস করেন। সাধারণত দিল্লি আর গুরুগ্রামের আবহাওয়ার তেমন ফারাক থাকে না। কিন্তু এবছর সেই চেনা ছবি পুরোপুরি বদলে গেছে।
দিল্লি যেখানে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে কাঁপছে, সেখানে গুরুগ্রামে পারদ নেমে গেছে মাইনাসের ঘরে। কোথাও কোথাও তাপমাত্রা পৌঁছেছে মাইনাস ০.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। শুধু ঠান্ডা নয়, শহরের বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে পাতলা হলেও স্পষ্ট বরফের চাদর।
কর্পোরেট শহরে বরফ, বিশ্বাসই করতে পারছেন না মানুষ
গুরুগ্রাম মানেই বড় বড় আইটি অফিস, বহুজাতিক সংস্থা, শপিং মল আর উঁচু উঁচু আবাসন। এই শহরের সঙ্গে বরফের দৃশ্য একেবারেই মানায় না। তাই সকালে ঘুম থেকে উঠে খোলা জায়গা, গাড়ির ছাদ কিংবা ঘাসের উপর বরফ জমে থাকতে দেখে অনেকেই চোখ কপালে তুলেছেন।
যাঁরা বহু বছর ধরে গুরুগ্রামে বসবাস করছেন, তাঁরাও বলছেন এমন দৃশ্য তাঁরা কখনও দেখেননি। সাধারণ শীতে কুয়াশা থাকে, ঠান্ডা থাকে। কিন্তু বরফের চাদর—এটা গুরুগ্রামের জন্য একেবারেই বিরল।
৯০ বছরের পুরনো রেকর্ড ভাঙল ঠান্ডা
হাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গত ৯০ বছরে গুরুগ্রামে এমন তীব্র ঠান্ডা কখনও রেকর্ড হয়নি। চলতি সপ্তাহের শুরু থেকেই তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে নামতে শুরু করে। রাতের দিকে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
এই ঠান্ডা শুধু সংখ্যার হিসাবেই নয়, অনুভূতির দিক থেকেও রেকর্ড ভাঙা। শুকনো ঠান্ডা হওয়ায় শরীর দ্রুত ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। মোটা জামাকাপড় পরেও অনেকের কাঁপুনি থামছে না।
দিল্লির চেয়ে গুরুগ্রাম কেন বেশি ঠান্ডা?
অনেকের মনেই প্রশ্ন, দিল্লি এত কাছে হয়েও গুরুগ্রামে কেন এত ঠান্ডা? আবহাওয়াবিদদের মতে, এর পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। শহরের খোলা জায়গা, রাতের আকাশ পরিষ্কার থাকা এবং শুষ্ক বাতাস—সব মিলিয়ে গুরুগ্রামে তাপমাত্রা দ্রুত নামছে।
এছাড়া পশ্চিমী ঝঞ্ঝার প্রভাব কম থাকায় বাতাসে আর্দ্রতা নেই। ফলে ঠান্ডা আরও তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি শুধু গুরুগ্রামেই নয়, গোটা উত্তর ভারতের উপর প্রভাব ফেলেছে।
সিমলার থেকেও ঠান্ডা গুরুগ্রাম!
সবচেয়ে চমকে দেওয়ার বিষয়, এই মুহূর্তে সিমলার থেকেও গুরুগ্রামে বেশি ঠান্ডা অনুভূত হচ্ছে। পাহাড়ি শহর সিমলা মানেই তীব্র শীতের ছবি। কিন্তু এবার সেই ধারণাও উল্টে গেছে।
সমতলের শহর হয়েও গুরুগ্রাম পাহাড়ি এলাকার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঠান্ডা দেখাচ্ছে। এই ঘটনা আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের কাছেও ব্যতিক্রমী বলে মনে হচ্ছে।
গোটা উত্তর ভারতে ঠান্ডার দাপট
এই চিত্র শুধু গুরুগ্রামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দিল্লি, হরিয়ানা, পাঞ্জাব, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ—সব জায়গাতেই ঠান্ডার দাপট প্রবল। রাতের তাপমাত্রা দ্রুত নামছে। কুয়াশার সঙ্গে শুকনো ঠান্ডা মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
অনেক বয়স্ক মানুষ বলছেন, তাঁদের জীবনে এমন শীত আগে কখনও দেখেননি। সকালবেলা ঘর থেকে বেরোনোই যেন একরকম যুদ্ধ। রাস্তায় হাঁটা কঠিন, গাড়ি চালানো ঝুঁকিপূর্ণ।
দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব
এই রেকর্ড ভাঙা ঠান্ডা সাধারণ মানুষের জীবনে বড় প্রভাব ফেলেছে। অফিস টাইমে দেরি হচ্ছে। স্কুলগামী শিশুদের জন্য চিন্তা বাড়ছে। অনেক জায়গায় সকালবেলা কুয়াশা আর ঠান্ডার কারণে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষদের জন্য এই ঠান্ডা বিশেষভাবে বিপজ্জনক। অনেকেই বাড়ির বাইরে না বেরোনোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। হিটার, ব্লোয়ার, আগুন—সবকিছুর চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গেছে।
সামনে কী হতে পারে?
আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, আগামী কয়েকদিন এই ঠান্ডা পরিস্থিতি বজায় থাকতে পারে। পশ্চিমী ঝঞ্ঝা দুর্বল থাকায় বড় কোনও পরিবর্তনের ইঙ্গিত আপাতত নেই। তবে যদি হালকা বৃষ্টি বা মেঘ আসে, তাহলে তাপমাত্রার চরিত্রে কিছুটা বদল হতে পারে।
ততদিন পর্যন্ত মানুষকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। খুব প্রয়োজন ছাড়া সকালে বাইরে না বেরোনো, পর্যাপ্ত গরম পোশাক ব্যবহার করা এবং বয়স্কদের বিশেষ যত্ন নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।


