বাংলাদেশে শীত এলেই একটা পরিচিত কথা কানে আসে—
“পৌষের শীত মোষের গায়, মাঘের শীতে বাঘ পালায়।”
এই প্রবাদটা শুধু কথার কথা না। বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে। পৌষে শীতটা ধীরে ধীরে চেপে বসে, আর মাঘে এসে তা যেন হাড়ে গেঁথে যায়।
বাংলাদেশে মূলত পৌষ ও মাঘ—এই দুই মাস মিলেই শীতকাল ধরা হয়। ইংরেজি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী জানুয়ারি সাধারণত বছরের সবচেয়ে ঠান্ডা সময়। তবে অনেক সময় অগ্রহায়ণ মাসের শেষ দিক থেকেই শীতের আভাস পাওয়া যায়। ভোরের কুয়াশা, হিমেল বাতাস আর সূর্যের দেখা না পাওয়া দিন—সব মিলিয়ে শীত ধীরে ধীরে নিজের উপস্থিতি জানান দেয়।
এবারের শীতও আলাদা কিছু নয়। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকেই দেশজুড়ে শীতের তীব্রতা বেড়েছে। কোথাও কোথাও টানা কয়েক দিন সূর্যের মুখ দেখা যায়নি। চারপাশ ছিল ঘন কুয়াশায় ঢাকা। বিশেষ করে ডিসেম্বরের শেষ দিকে এমন অবস্থা হয়েছে, যে অনেকেই হাঁটতে হাঁটতে মনে করেছেন নাকে-মুখে গুঁড়ি গুঁড়ি পানির ফোঁটা পড়ছে। চোখে দেখা যায়নি, কিন্তু শরীর বুঝে নিয়েছে।
অনেকের মনে প্রশ্ন জেগেছে—এটাই কি বাংলাদেশের সবচেয়ে শীত?
ইতিহাস বলছে, না। বাংলাদেশ এর আগেও আরও ভয়ংকর, আরও হাড় কাঁপানো শীত দেখেছে।
বাংলাদেশে সর্বনিম্ন তাপমাত্রার রেকর্ড কোথা থেকে আসে
বর্তমানে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের অধীনে দেশজুড়ে ৪৮টি আবহাওয়া স্টেশন রয়েছে। এই স্টেশনগুলো নিয়মিত তাপমাত্রা, বৃষ্টি, বাতাস ও অন্যান্য আবহাওয়াগত তথ্য সংগ্রহ করে।
বাংলাদেশ স্বাধীন হয় ১৯৭১ সালে। তবে আবহাওয়া অধিদপ্তরের কাছে তাপমাত্রার রেকর্ড আছে আরও আগের, অর্থাৎ ১৯৪৭ সাল থেকে। তখন স্টেশন সংখ্যা কম ছিল, অনেক জায়গায় ম্যানুয়াল থার্মোমিটার ব্যবহার করা হতো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তি উন্নত হয়েছে, স্টেশনও বেড়েছে।
এই দীর্ঘ সময়ের তথ্য বিশ্লেষণ করলেই দেখা যায়, বাংলাদেশের তাপমাত্রা একাধিকবার তিন ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমেছে।
কোন কোন বছরে সবচেয়ে কম তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছিল
১৯৬৪ সাল বাংলাদেশের শীতের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য বছর। সে বছর সিলেটের শ্রীমঙ্গলে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৩.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তখনই বোঝা গিয়েছিল, দেশের কিছু এলাকায় শীত কতটা ভয়ংকর হতে পারে।
এর চার বছর পর পরিস্থিতি আরও চরম আকার নেয়। ১৯৬৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি শ্রীমঙ্গলে তাপমাত্রা নেমে আসে ২.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। এটি তখনকার সময়ে দেশের ইতিহাসে অন্যতম সর্বনিম্ন তাপমাত্রা হিসেবে ধরা হয়।
স্বাধীনতার পর দীর্ঘদিন এই রেকর্ড অক্ষত ছিল। কেউ ভাবেনি, এটি একদিন ভাঙবে। কিন্তু ঠিক ৫০ বছর পর, ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে ইতিহাস বদলে যায়।
সেই বছর পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় তাপমাত্রা নেমে আসে ২.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। এটিই এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাসে রেকর্ড করা সবচেয়ে কম তাপমাত্রা। অর্থাৎ, এটি এখনও সর্বনিম্ন রেকর্ড হিসেবে বহাল আছে।
২০১৮ সালেই উত্তরাঞ্চলের আরও কয়েকটি জায়গায় তীব্র শীত দেখা যায়। রংপুর বিভাগের সৈয়দপুরে তাপমাত্রা নেমে আসে ২.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। নীলফামারীর ডিমলায় ছিল ৩ ডিগ্রি, কুড়িগ্রামের রাজারহাটে ৩.১ ডিগ্রি এবং দিনাজপুরে ৩.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
এর আগেও ২০১৩ সালে উত্তরাঞ্চলে প্রবল শীত পড়ে। সে সময় রংপুরে তাপমাত্রা ছিল ৩.৫ ডিগ্রি, দিনাজপুরে ৩.২ ডিগ্রি এবং সৈয়দপুরে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
এই তালিকায় রাজশাহীর নামও আছে। ২০০৩ সালে সেখানে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৩.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা এখনো রাজশাহীর ইতিহাসে অন্যতম শীতল দিন হিসেবে ধরা হয়।
উত্তরাঞ্চলেই কেন সবচেয়ে বেশি শীত পড়ে
লক্ষ করলে দেখা যায়, প্রায় সব সর্বনিম্ন তাপমাত্রার রেকর্ডই উত্তরাঞ্চলের। এর পেছনে রয়েছে ভৌগোলিক ও আবহাওয়াগত কারণ।
আবহাওয়াবিদরা বলেন, বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলই শৈত্যপ্রবাহের প্রবেশদ্বার। শীতকালে উত্তর ভারতের দিল্লি, কাশ্মীর, উত্তরপ্রদেশ ও বিহার অঞ্চলে প্রচণ্ড ঠান্ডা পড়ে। স্বাভাবিক বায়ুপ্রবাহের নিয়ম অনুযায়ী বাতাস পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়।
এই ঠান্ডা বাতাস ভারতের বিভিন্ন রাজ্য পেরিয়ে রাজশাহী, কুষ্টিয়া, যশোর বেল্ট ধরে বাংলাদেশে ঢোকে। হিমালয় পাহাড় সরাসরি ঠান্ডা বাতাস ঢুকতে বাধা দেয়, তাই এই মাঝামাঝি অঞ্চল দিয়েই বাতাস প্রবেশ করে।
আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশিদ জানান, উত্তরাঞ্চলে খোলা মাঠ বেশি হওয়ায় রাতে তাপ দ্রুত বের হয়ে যায়। আবার ঘন কুয়াশা সূর্যের আলো ঢুকতে দেয় না। ফলে দিনের বেলাতেও তাপমাত্রা বাড়ে না।
তীব্র শীতের পেছনের আসল কারণ কী
অনেকে মনে করেন, শুধু কম তাপমাত্রাই শীত বেশি লাগার কারণ। আসলে বিষয়টা এত সহজ নয়।
আবহাওয়াবিদদের মতে, ঘন কুয়াশাই শীতের তীব্র অনুভূতির প্রধান কারণ। কুয়াশা দীর্ঘ সময় থাকলে সূর্যের আলো মাটিতে পৌঁছাতে পারে না। ফলে ভূমি গরম হয় না, ঠান্ডা জমে থাকে।
আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, কুয়াশা কাটার প্রধান উপায় হলো বৃষ্টি বা বাতাসের গতি বাড়া। বাতাস ঘণ্টায় ৮ থেকে ১৫ কিলোমিটার বেগে বইলে কুয়াশা অনেকটাই সরে যায়।
তবে বাতাস বাড়ার জন্য বঙ্গোপসাগরে উচ্চচাপ বলয় তৈরি হওয়া দরকার। সেই সঙ্গে পশ্চিম দিক থেকে আসা ওয়েস্টার্লি ডিসটার্বেন্স সক্রিয় হলে ঠান্ডা ও বাতাস দুটোই বাড়ে।
দিন-রাতের তাপমাত্রার পার্থক্যও বড় কারণ
শীত বেশি লাগার আরেকটি বড় কারণ হলো দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য কমে যাওয়া। আগে দিনে কিছুটা গরম লাগত, রাতে ঠান্ডা বাড়ত। এখন অনেক সময় দিনেও তাপমাত্রা বাড়ে না।
বজলুর রশিদ বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কুয়াশা বেড়েছে অস্বাভাবিকভাবে। একবার এমনও হয়েছে, দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য ছিল মাত্র ১.৭ ডিগ্রি। গত ২০ বছরে এমনটা তিনি দেখেননি।
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে কি এর সম্পর্ক আছে
সর্বনিম্ন তাপমাত্রার বছরগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এগুলো কোনো নির্দিষ্ট বিরতিতে হয়নি। কখনও চার বছর পর, কখনও ৩৫ বছর পর, আবার কখনও মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে।
আবহাওয়াবিদরা বলেন, যদি নির্দিষ্ট প্যাটার্ন থাকত, তাহলে একে সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের ফল বলা যেত। তবে তারা এটাও বলছেন, শীতের সময়কাল দিন দিন ছোট হয়ে যাচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, শীত দেরিতে শুরু হচ্ছে এবং দ্রুত শেষ হচ্ছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণেই এমনটা হচ্ছে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন।
বাংলাদেশে আবার ঘন কুয়াশা ও স্মগ বাড়ার পেছনে দূষণের বড় ভূমিকা রয়েছে। বাতাসে ধোঁয়া ও ধুলা মিশে কুয়াশাকে আরও ঘন করে তোলে। তখন নিচু স্তরে ‘মিস্ট’ তৈরি হয়, যা হাঁটার সময় গায়ে পানি পড়ার মতো অনুভূতি দেয়।
শেষ কথা
বাংলাদেশের শীত শুধু কম তাপমাত্রার গল্প নয়। এটি কুয়াশা, বাতাস, ভৌগোলিক অবস্থান আর বৈশ্বিক পরিবর্তনের সম্মিলিত ফল।
এবারের শীত যতই তীব্র মনে হোক, ইতিহাস বলছে—বাংলাদেশ আরও কঠিন শীত পার করেছে। তবে ভবিষ্যতে শীতের ধরন কেমন হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে জলবায়ু, দূষণ আর প্রাকৃতিক ভারসাম্যের ওপর।
একটা বিষয় নিশ্চিত—বাংলাদেশের শীত মানেই শুধু কম ডিগ্রি নয়, বরং এক গভীর, ধীর আর নিঃশব্দ ঠান্ডার অভিজ্ঞতা।


