পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট চিরকালই পর্বতারোহী ও পাহাড়প্রেমীদের অদম্য আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। প্রতিটি শীতে ও গ্রীষ্মে এর রহস্য আর শীতলতাই যেন নতুন করে মানুষকে হাতছানি দেয়। এই বরফে ঢাকা শৃঙ্গ শুধু উঁচু নয়, এখানে প্রকৃতির প্রতিটি চ্যালেঞ্জ যেন জীবন আর মৃত্যুর মধ্যবর্তী সূক্ষ্ম সীমারেখাকে নতুন করে চিনিয়ে দেয়।
এভারেস্টের পারদ কতটা নিচে নামে
এভারেস্টের তাপমাত্রা শুনলে যে কেউ স্তম্ভিত হবেন। এখানে বছরের বিভিন্ন সময়ে পারদের ওঠানামা হয়। তবে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর শীতলতা নেমে আসে ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসে। এই সময়ে পারদ নেমে যায় মাইনাস ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত, যা ফারেনহাইটে মাইনাস ৭৬ ডিগ্রি। এত নিচু তাপমাত্রায় মানুষের দেহ তাত্ক্ষণিকভাবে হাইপোথারমিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে। হাড়ভাঙা ঠান্ডায় দাঁড়িয়ে থাকা শুধু কঠিন নয়, প্রায় অসম্ভব।
উচ্চতায় অক্সিজেনের ঘাটতি
এভারেস্টের উচ্চতা ৮,৮৪৮.৮৬ মিটার (২৯,০৩১.৭ ফিট)। এই উচ্চতায় বাতাসে অক্সিজেনের ঘনত্ব সমতলের তুলনায় মাত্র ৩০%। ফলে অতিরিক্ত শীতের সঙ্গে অক্সিজেনের স্বল্পতা পর্বতারোহীদের জন্য ভয়ংকর চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। এজন্য শীতকালে এভারেস্ট জয় করার প্রচেষ্টা প্রায় অসাধ্য।
ঝড়ের গতিতে খড়কুটোর মত উড়ে যেতে পারে মানুষ
এভারেস্টে বাতাসের গতি শীতে আরও ভয়ঙ্কর রূপ নেয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এভারেস্টে ঝড়ের সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ২৮০ কিলোমিটার, অর্থাৎ প্রায় ১৭৫ মাইল প্রতি ঘণ্টা। এই গতি এতটাই শক্তিশালী যে মানুষ সহজেই খড়কুটোর মত উড়ে যেতে পারে। এই বাতাসের মুখে কেউ দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না, সরাসরি প্রাণহানির আশঙ্কা।
কেন শীতে এভারেস্টে অভিযান হয় না
প্রায় সকল পর্বতারোহী শীতকাল এড়িয়ে চলেন। মূলত মার্চ থেকে মে এবং সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর—এই দুই ঋতুই এভারেস্ট অভিযানের প্রধান সময়। শীতে প্রবল ব্লিজার্ড, তুষারঝড় আর তীব্র ঠান্ডা একসাথে পর্বতারোহীদের মৃত্যুর ফাঁদে ফেলে দিতে পারে। তাই বছরের ওই ভয়াল সময়ে শৃঙ্গের চূড়া কার্যত অগম্য হয়ে পড়ে।
বেস ক্যাম্পের পরিস্থিতি
এভারেস্ট বেস ক্যাম্প সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫,৩৬৪ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। এখানেও শীতে তাপমাত্রা প্রায় মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নামতে পারে। হিমশীতল বাতাসে তুষারপাতের পাশাপাশি হিমবাহ থেকে ধসে পড়া বরফও এক বড় বিপদ।
শীর্ষে পৌঁছানোর চরম ঝুঁকি
শুধু ঠান্ডা আর বাতাস নয়, এভারেস্টে মৃত্যুর আরেক বড় কারণ হলো অক্সিজেন সঙ্কট। শীর্ষে ওঠার পথে এক পর্যায়ে মানবদেহে অক্সিজেনের ঘাটতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে মস্তিষ্ক, হৃদপিণ্ড, ফুসফুস কাজ করতে অস্বাভাবিক হয়ে যায়। অনেকেই ফ্রস্টবাইট, হাইপোথারমিয়া ও হাই অ্যাল্টিচিউড পালমোনারি এডিমা (HAPE) রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারান।
যখন হাওয়া মৃত্যু ডেকে আনে
জেট স্ট্রিম নামের বায়ুপ্রবাহ এভারেস্টের উপর দিয়ে বয়ে যায়। এই বায়ুপ্রবাহের গতি ঘণ্টায় ১৬০ থেকে ২৮০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। জেট স্ট্রিমের এই গতি যখন শীতের সাথে মিলে যায়, তখনই এভারেস্টের প্রকৃতি হয়ে ওঠে এক ভয়ঙ্কর মৃত্যুকূপ। পর্বতারোহীদের দেহ ভেসে যেতে পারে বা হিমবাহের ফাটলে তলিয়ে যেতে পারে এক নিমিষেই।
ক্লাইম্বারদের প্রস্তুতি
যারা এভারেস্টে অভিযান করেন, তারা দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ, বিশেষ গিয়ার এবং যথেষ্ট অভিজ্ঞতা ছাড়া রওনা হন না। বিশেষ ডাউন স্যুট, হাই অ্যাল্টিচিউড বুট, অক্সিজেন সিলিন্ডার আর বিশেষভাবে তৈরি তাঁবু না থাকলে জীবন রক্ষা প্রায় অসম্ভব। তবু প্রকৃতির রুদ্ররূপের কাছে অনেক সময়েই এই প্রস্তুতি যথেষ্ট নয়।
এভারেস্ট এখনও বাড়ছে
একটি বিস্ময়কর তথ্য হলো, এভারেস্ট এখনও প্রতি বছর প্রায় ৪ মিলিমিটার করে উঁচু হচ্ছে। নেপাল ও তিব্বতের টেকটনিক প্লেটগুলোর চলাচলের কারণে এই উঁচু হওয়ার প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে। ফলে ভবিষ্যতেও এভারেস্ট জয় আরও চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।
পর্বতারোহীদের অমর স্বপ্ন
সব ঝুঁকি, শীত আর ঝড় সত্ত্বেও মাউন্ট এভারেস্ট মানুষের কাছে একটি চরম গর্বের শৃঙ্গ হয়ে আছে। এখানে পা রাখা মানেই নতুন ইতিহাস লেখা। বহু মানুষ জানেন এভারেস্টের ভয়ঙ্কর শীত আর মৃত্যুর হুমকির কথা, তবুও পর্বতারোহীদের স্বপ্নে কখনো ছেদ পড়ে না।
শেষ কথা
মাউন্ট এভারেস্ট কেবল একটি পাহাড় নয়, এটি প্রকৃতির শক্তি আর মানুষের অদম্য স্বপ্নের এক অনন্য মিলনস্থল। প্রতিটি শীতে এভারেস্ট তার শীতলতা আর বেগবান ঝড়ের গতি দিয়ে মানুষকে বুঝিয়ে দেয়, প্রকৃতির সামনে মানুষের সাহস আর কৌশল কতটা ক্ষুদ্র! তবু মানুষ স্বপ্ন দেখে, চেষ্টা করে এবং বারবার শৃঙ্গ ছুঁয়ে আসে। হয়তো এটাই মানুষের প্রকৃত জয়।


