মাঘ মাস এলেই আমাদের মনে ভেসে ওঠে কনকনে ঠান্ডার ছবি। ভোরের কুয়াশা, হাড় কাঁপানো বাতাস, আর গায়ে লেপ জড়িয়ে বসে থাকা সকাল। আমাদের মুখে মুখে চলে পুরনো সেই কথা—পৌষের শীত মোষের গায়, মাঘের শীতে বাঘ পালায়। কিন্তু এবার মাঘের শুরুতেই যেন সেই চেনা শীতের ছবিটা একটু বদলে গেছে। অনেকেই বলছেন, শীতটা কোথায় গেল? সকালে বেরিয়ে আর আগের মতো কাঁপুনি লাগছে না। দুপুরে তো রীতিমতো গরম লাগছে।
কদিন আগেও কিন্তু চিত্রটা একেবারেই আলাদা ছিল। পৌষ মাসের শেষ দিক আর জানুয়ারির শুরুতে টানা কুয়াশা আর ঠান্ডায় নাজেহাল ছিল মানুষ। অনেক জায়গায় দিনের পর দিন সূর্যের দেখা মেলেনি। স্কুলে যেতে বাচ্চারা কাঁপছিল, মাঠে কাজ করা মানুষগুলো আগুন জ্বালিয়ে শরীর গরম করছিল। তখন মনে হচ্ছিল, এ বছর বুঝি শীতটা একটু বেশিই থাকবে।
জানুয়ারিতে শীত বেশি হয় কেন
বাংলাদেশের আবহাওয়ার একটা স্বাভাবিক নিয়ম আছে। সাধারণত জানুয়ারি মাসেই সবচেয়ে বেশি শীত পড়ে। এই সময় উত্তর দিক থেকে ঠান্ডা বাতাস নামে। তাপমাত্রা দ্রুত কমে যায়। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময় থেকে ধীরে ধীরে সেই শীত কমতে শুরু করে। তারপর বসন্তের আগমন।
এ বছরও জানুয়ারির শুরুতে সেই চেনা শীতের দাপট দেখা গেছে। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। দিনের বেলা তাপমাত্রা হঠাৎ বেড়ে যায়। রাতে শীত থাকলেও দিনের রোদে সেটা অনেকটাই মিলিয়ে যাচ্ছে।
এখন দেশের তাপমাত্রার অবস্থা
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, দেশের বেশিরভাগ জেলায় এখন তাপমাত্রা আগের তুলনায় বেশি। যদিও উত্তরের কিছু জেলায় এখনও মৃদু শৈতপ্রবাহ চলছে। যেমন দিনাজপুর, পঞ্চগড় আর রংপুর অঞ্চলে এখনও শীতের প্রভাব আছে। তবে সেটাও আগের মতো তীব্র নয়।
শুক্রবার দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে তেঁতুলিয়ায়, আট দশমিক পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর সবচেয়ে বেশি তাপমাত্রা ছিল টেকনাফে, প্রায় ঊনত্রিশ ডিগ্রির ওপরে। ভাবুন তো, একই দেশে সকালে কাঁপুনি, আবার দুপুরে গরম।
দিন আর রাতের তাপমাত্রার বড় ফারাক
আবহাওয়াবিদদের মতে, এবার শীত কম মনে হওয়ার বড় কারণ দিন আর রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য। কয়েকদিন আগে দিন আর রাতের তাপমাত্রার তফাৎ খুব কম ছিল। তখন সারাদিনই ঠান্ডা লাগত। কিন্তু এখন চিত্রটা বদলেছে।
দিনে সূর্যের তাপ বেশি পাচ্ছে দেশ। তাই দিনের তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে। রাতে অবশ্য এখনও ঠান্ডা অনুভূত হচ্ছে। এই কারণেই শীতটা যেন অদ্ভুত লাগছে। সকালে আর রাতে শীত, দুপুরে হালকা গরম।
শীত কি আবার বাড়বে
অনেকের মনে প্রশ্ন, আবার কি সেই কনকনে ঠান্ডা ফিরবে? আবহাওয়াবিদ কাজী জেবুন্নেসা বলছেন, তেমন সম্ভাবনা কম। তার মতে, শৈতপ্রবাহ পুরোপুরি শেষ হয়নি ঠিকই, কিন্তু এর এলাকা অনেকটাই ছোট হয়ে এসেছে।
কয়েকদিন আগে দেশের প্রায় পঞ্চাশের বেশি জেলায় একসঙ্গে শৈতপ্রবাহ বয়ে গেছে। এখন সেটা নেমে এসেছে মাত্র তিন থেকে চারটি জেলায়। আগামী কয়েকদিনে দিনের তাপমাত্রা আরও একটু বাড়তে পারে। ফলে শীতের অনুভূতি আরও কমে যাবে।
ঢাকার শীত কেন কম লাগছে
রাজধানী ঢাকায় শীত এখন অনেকটাই হালকা। সকালে আর রাতে ঠান্ডা থাকলেও দিনে সেটা টের পাওয়া যাচ্ছে না। আবহাওয়াবিদদের ভাষায়, ঢাকায় এমন পরিস্থিতি আরও দু’একদিন থাকতে পারে। দিনের তাপমাত্রা সামান্য বাড়বে। এক সপ্তাহের মতো মোটামুটি একই রকম আবহাওয়া থাকতে পারে।
ঢাকায় এবছর সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল এগারো ডিগ্রির আশেপাশে। এটা খুব বেশি কম না হলেও শীতের সময় মানুষের ভোগান্তির জন্য যথেষ্ট।
কুয়াশা কি থাকবে
আবহাওয়া অফিস বলছে, শেষরাত থেকে সকাল পর্যন্ত দেশের কিছু এলাকায় হালকা থেকে মাঝারি কুয়াশা থাকতে পারে। তবে আগের মতো সারাদিন ঘন কুয়াশা থাকার সম্ভাবনা নেই। আকাশ মাঝে মাঝে আংশিক মেঘলা হতে পারে। তবে বৃষ্টির কোনো সম্ভাবনা নেই।
এর মানে দাঁড়াচ্ছে, সকালে বের হলে কুয়াশার কারণে একটু সাবধানে চলতে হবে। বিশেষ করে মহাসড়কে।
শীত বিদায় নিচ্ছে নাকি ধীরে কমছে
অনেকে বলছেন, শীত বুঝি বিদায় নিচ্ছে। তবে আবহাওয়াবিদরা বলছেন, একেবারে বিদায় বলা যাবে না। বরং বলা যায়, শীতটা ধীরে ধীরে দুর্বল হচ্ছে। বড় কোনো পরিবর্তন আর আসার সম্ভাবনা কম।
মাসের শেষের দিকে তাপমাত্রা আরও একটু বাড়তে পারে। তখন শীতের অনুভূতি আরও কমে যাবে। তবে রাতের দিকে হালকা ঠান্ডা থাকতে পারে।
উত্তরাঞ্চলে স্বস্তি ফিরছে
দেশের উত্তরাঞ্চলে এবছর শীত সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি এনেছিল। অনেক জায়গায় গাছপালা ঝরে পড়েছে। মাঠের কাজ ব্যাহত হয়েছে। কিন্তু এখন সেখানে রোদের দেখা মিলছে। ঠান্ডা বাতাসের গতি কমেছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে।
সকালবেলা কাজ করতে বের হওয়া মানুষগুলো এখন আর আগের মতো কাঁপছে না। বাচ্চারাও স্কুলে যেতে তুলনামূলক স্বস্তি পাচ্ছে।
শেষ কথা
সব মিলিয়ে বলা যায়, এবছর মাঘের শুরুটা একটু ব্যতিক্রম। শীত আছে, কিন্তু আগের মতো দাপট নেই। দিনের রোদ আর রাতের ঠান্ডার এই মিশ্রণটাই মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। আপাতত বড় কোনো শৈতপ্রবাহের সম্ভাবনা নেই। তাই ভারী শীতের প্রস্তুতি না নিয়ে হালকা শীতের সঙ্গেই মানিয়ে নেওয়াই বুদ্ধিমানের।
মাঘ মানেই যে শুধু কাঁপুনি, এবার প্রকৃতি যেন সেই ধারণাটাকেই একটু বদলে দিল।


