রাজস্থান, যাকে সাধারণত মরুরাজ্য বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে শুষ্ক আবহাওয়া ও বালির রাজ্য হিসেবে পরিচিত। তবে ২০২৫ সালের জুলাই মাসে এই রাজ্যে এমন প্রবল বর্ষণ ও বন্যা দেখা গেছে, যা শেষবার ঘটেছিল ১৯৫৬ সালে। অর্থাৎ, ৬৯ বছর পর রাজস্থানের মানুষ এমন বর্ষার মুখোমুখি হয়েছে, যা তাদের জীবদ্দশায় আগে কখনো হয়নি। এ প্রতিবেদন আমরা বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করব কিভাবে এই জুলাই মাস রাজস্থানের ভূমি ও জনজীবনে এক বিরাট পরিবর্তন এনেছে।
১৯৫৬ সালের পর রাজস্থানে ৬৯ বছরে সবচেয়ে ভারী জুলাই মাসের বর্ষণ
১৯৫৬ সালের জুলাই মাসে রাজস্থানে ৩০৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল। এরপর থেকে প্রায় সাত দশক পর্যন্ত এই পরিমাণে কোনো জুলাই মাসে বৃষ্টি হয়নি। তবে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে রাজস্থানের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত হয়েছে ২৮৫ মিলিমিটার। যদিও ১৯৫৬ সালের তুলনায় সামান্য কম, কিন্তু দীর্ঘদিনের ন্যায়শৃঙ্খলা ও পরিমিত বর্ষণের বদলে এটি ছিল এক ভয়ংকর প্রবল বর্ষণ, যা বহু এলাকা প্লাবিত করেছে।
রাজস্থানের জলের ঘূর্ণিঝড়: চম্বল নদীর ভয়াবহ পানি প্রবাহ
চম্বল নদী, যা সাধারণত শুকনো ও শান্ত থাকে, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ঢোলপুর অঞ্চলে বিপদসীমার থেকে ১২ মিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এটির ফলে নদীর তীরে অবস্থিত বহু গ্রাম ও শহর প্লাবিত হয়েছে। নদীর অতিবৃদ্ধি অনেক জায়গায় সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করেছে। অনেক স্থানে বাড়িঘর ভেঙে পড়েছে, কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে গেছে।
রাজস্থানের জলাধার ও বাঁধের চাপ ও বন্যার বিস্তার
বিভিন্ন জলাধার ও বাঁধ বর্তমানে জলসীমার ওপর দিয়ে পানি ধরে রাখতে পারছে না। বাধ্য হয়ে জল ছাড়তে হচ্ছে, যা অনেক নিচু অঞ্চলে প্রবল বন্যার সৃষ্টি করছে। এই অবস্থা রাজস্থানের বিভিন্ন শহর ও গ্রামজুড়ে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করেছে। নিকটবর্তী রাজাখেরা অঞ্চলে সেনাবাহিনীকে উদ্ধার কাজ পরিচালনা করতে নামতে হয়েছে।
মানব ও গবাদি পশুর দুর্দশা: বন্যার প্রভাব
বর্ষার এই অস্বাভাবিক প্রবাহে বহু মানুষকে তাদের বাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়েছে। শিশু, বৃদ্ধ, গর্ভবতী মহিলাসহ অসহায় মানুষজন আতঙ্কে পড়েছে। এছাড়া গবাদি পশুরাও পানির তলায় পড়ে বিপন্ন হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে ত্রাণ কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা হলেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
জুলাই মাসের বৃষ্টিপাতের প্রভাব ও কৃষিক্ষেত্রে ধ্বংস
রাজস্থানের কৃষি এলাকা দীর্ঘদিন শুষ্ক থাকলেও এই বর্ষায় জমিগুলোতে প্রবল জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে ফসল পেকে ওঠার আগেই নষ্ট হয়েছে। ফলস্বরূপ, বহু কৃষকের জীবিকা বিপন্ন হয়েছে। পানির অভাবে দীর্ঘদিন ধরেই কৃষিক্ষেত্র ঝুঁকির মুখে ছিল; এবার অতিবৃষ্টি তাদের জীবনে নতুন সংকট নিয়ে এসেছে।
আগাম আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং ভবিষ্যৎ ঝুঁকি
আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, রাজস্থানের আজমের, জয়পুর, কোটা, বিকানের ও ভরতপুর জেলা আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে আরও অতি প্রবল বৃষ্টি হতে পারে। এটি বন্যার ভয়াবহতা বৃদ্ধি করার আশঙ্কা তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন, এই সময়ে জল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও জরুরি ত্রাণ কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা অত্যন্ত জরুরি।
রাজস্থানের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব: এক দৃষ্টিভঙ্গি
রাজস্থানের মতো মরুভূমি অঞ্চলে এমন প্রবল বর্ষণ ও বন্যা একটি স্পষ্ট সংকেত যে, জলবায়ু পরিবর্তন মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। অতীতে যেখানে বর্ষার অভাব ছিল, আজ সেখানে জলাবদ্ধতা ও বন্যার মতো বিপর্যয় দেখা যাচ্ছে। বৃষ্টিপাতের এই অস্বাভাবিক ধারা রাজস্থানের পরিবেশ ও অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে।
সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ: প্রতিক্রিয়া ও সমাধান
রাজস্থান সরকার ও কেন্দ্রীয় প্রশাসন ইতিমধ্যেই বন্যার কবলিত এলাকায় উদ্ধার ও পুনর্বাসন কাজ শুরু করেছে। সেনাবাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন, এবং বিভিন্ন এনজিও সক্রিয় হয়ে ত্রাণ ও চিকিৎসা সেবা প্রদান করছে। তবে, এই বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী জল নিয়ন্ত্রণ নীতি, বন্যা প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং পরিবেশ সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
সমাজ ও মানুষের অভিজ্ঞতা: অতীত স্মৃতির সাথে বর্তমানের মিল
যাঁরা ১৯৫৬ সালে রাজস্থানে ছিলেন, তাঁদের অধিকাংশই এখন বয়স্ক। তাঁরা বলেছেন, সেই সময়ের মতো প্রবল বর্ষণ তাঁরা খুব কমই দেখেছেন। বর্তমানের এই বর্ষণ তাঁদের স্মৃতির অতীতকে ফের জাগিয়ে তুলেছে। তবে নতুন প্রজন্মের কাছে এটি একটি সতর্কবার্তা, যা জলবায়ু ও প্রকৃতির পরিবর্তনের বাস্তব ছবি তুলে ধরে।
উপসংহার: রাজস্থানের জন্য এক নতুন জলবায়ু বাস্তবতা
২০২৫ সালের জুলাই মাস রাজস্থানের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে। ৬৯ বছর পর এমন প্রবল বর্ষণ ও বন্যার সম্মুখীন হয়ে রাজস্থান বুঝতে পারছে যে, জলবায়ু পরিবর্তন আর কোন দূরদর্শী বিষয় নয়, বরং তা এখন বাস্তব ও হাতে-কলমে মাপা যায় এমন সংকট। জরুরি ভিত্তিতে পরিবেশ সংরক্ষণ, জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।


