রিফাত-বিন-ত্বহা ।। যশোরে টানা তীব্র শীতে জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। ঘন কুয়াশা, হিমেল হাওয়া আর সূর্যের অনুপস্থিতিতে শীতের প্রকোপ দিন দিন বেড়েই চলেছে। টানা কয়েক দিন ধরে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হওয়ার পরও শীতের তীব্রতা কমেনি। বরং সূর্যের দেখা না মেলায় ঠান্ডা আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
টানা সূর্যহীন দিনে বাড়ছে শীতের তীব্রতা
যশোরে টানা দুই দিন ধরে সূর্যের দেখা নেই। সোমবার জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১৩ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যদিও আগের দিনের তুলনায় তাপমাত্রা কিছুটা বেড়েছে, তবে আকাশে সূর্যের দেখা না পাওয়ায় শীতের অনুভূতি কমেনি। ভোর থেকেই কুয়াশাচ্ছন্ন আকাশ আর ঠান্ডা বাতাসে জনজীবন জবুথবু হয়ে পড়ে।
এর আগে শনিবার ও শুক্রবার যশোরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল যথাক্রমে ৮ দশমিক ৮ ও ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা সারাদেশের মধ্যে সর্বনিম্ন ছিল। এসব কারণে যশোরে মৃদু থেকে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ বইছে বলে মনে করছেন আবহাওয়া সংশ্লিষ্টরা।

শৈত্যপ্রবাহে সবচেয়ে বিপাকে শ্রমজীবী মানুষ
এই তীব্র শীত সবচেয়ে বেশি কষ্টে ফেলেছে শ্রমজীবী ও খেটে খাওয়া মানুষদের। দিনমজুর, কৃষি শ্রমিক, ভ্যানচালক ও রিকশাচালকদের জন্য শীত যেন নিত্যদিনের লড়াই হয়ে উঠেছে। ভোরের কনকনে ঠান্ডায় কাজে বের হলেও অনেকের কাজ মিলছে না।
শহরের দড়াটানা এলাকায় রিকশাচালক আমিরুল জানান, কুয়াশা আর উত্তরের হাওয়ার কারণে যাত্রী কমে গেছে। শীতের জন্য মানুষ রিকশায় উঠতে চাইছে না। তবুও সংসারের তাগিদে প্রতিদিন ঘর থেকে বের হতে হচ্ছে তাকে। তার মতো অনেক শ্রমজীবী মানুষ একই বাস্তবতার মুখোমুখি।
শহরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বড় প্রভাব
তীব্র শীতের কারণে যশোর শহরে মানুষের স্বাভাবিক চলাচল কমে গেছে। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রাস্তাঘাট তুলনামূলক ফাঁকা দেখা যাচ্ছে। মানুষজন মোটা জ্যাকেট, সোয়েটার, মাফলার আর টুপি পরে জড়োসড়ো হয়ে চলাফেরা করছে। অনেকেই হাড় কাঁপানো ঠান্ডার কারণে ঘর থেকে বের হচ্ছেন না।
বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ ও শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে। শীতের কারণে স্কুলগামী শিশুদের উপস্থিতিও কম দেখা যাচ্ছে। বাজার ও খোলা জায়গায় মানুষের আনাগোনা আগের তুলনায় অনেক কম।
শীতের প্রভাবে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে
শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যশোরের হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপও বেড়েছে। ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন শিশু ও বয়স্করা। সর্দি, কাশি, জ্বর, নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টের রোগী বাড়ছে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সময় গরম কাপড় ব্যবহার, ঠান্ডা এড়িয়ে চলা এবং শিশু ও বয়স্কদের বাড়তি যত্ন নেওয়া জরুরি। শীতের কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ায় সামান্য অসাবধানতাও বড় সমস্যার কারণ হতে পারে।
ফুটপাতে বাড়ছে শীতবস্ত্রের বেচাকেনা
তীব্র শীতের সুযোগে যশোর শহরের ফুটপাত ও বাজারগুলোতে বেড়েছে শীতবস্ত্রের বেচাকেনা। সোয়েটার, জ্যাকেট, কম্বল ও গরম কাপড় কিনতে ভিড় করছেন সাধারণ মানুষ। নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য ফুটপাতের এসব দোকানই এখন ভরসা।
অনেকে পুরোনো কাপড় কিনে শীত মোকাবিলা করছেন। বিক্রেতারা বলছেন, শীত যত বাড়ছে, বিক্রিও তত বাড়ছে। তবে ক্রেতাদের বেশিরভাগই দরদাম করে কম দামে কাপড় কিনছেন।
কৃষিতে শৈত্যপ্রবাহের বিরূপ প্রভাব
শীতের এই পরিস্থিতি যশোর জেলার কৃষি খাতেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। জেলা কৃষি অফিস জানিয়েছে, মৃদু শৈত্যপ্রবাহের কারণে রবি ফসল, বোরো ধানের বীজতলা এবং মৌ খামারিদের মধু সংগ্রহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
জেলার আট উপজেলার মাঠে বর্তমানে সরিষা, ভুট্টা, পেঁয়াজ, রসুনসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফসল এবং বোরো ধানের বীজতলা রয়েছে। ঘন কুয়াশা ও অতিরিক্ত ঠান্ডায় এসব ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
কৃষকদের জন্য সতর্কবার্তা ও করণীয়
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোশাররফ হোসেন জানিয়েছেন, শীত ও ঘন কুয়াশার কারণে ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। কৃষিকাজে কিছুটা স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় কৃষকদের আগাম সতর্ক থাকতে বলা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ফসল সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে এবং মাঠ পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত ফসলের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছেন। কোনো ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে কৃষকের ক্ষতি কমানো যায়।
সামনে কেমন থাকতে পারে আবহাওয়া
আবহাওয়া সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আপাতত যশোরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শীতের এই পরিস্থিতি আরও কয়েক দিন থাকতে পারে। সূর্যের দেখা না মিললে শীতের অনুভূতি আরও বাড়বে। তাই সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, যশোরে চলমান শৈত্যপ্রবাহ জনজীবন, স্বাস্থ্য ও কৃষি—সব ক্ষেত্রেই বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। শীত মোকাবিলায় ব্যক্তি, সমাজ ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগই এখন সময়ের দাবি।


