শীত যেন এবার কোনো সতর্কতা ছাড়াই চেপে বসেছে। হাড় কাঁপানো ঠান্ডা বাতাস, ঘন কুয়াশা আর কমতে থাকা তাপমাত্রায় দেশের জনজীবন কার্যত স্থবির। ভোরের আলো ফুটলেও চারপাশে সূর্যের দেখা নেই। মনে হয় কুয়াশার চাদর গায়ে মেখে দেশটা ধীরে ধীরে আরও ঠান্ডার দিকে এগোচ্ছে। আবহাওয়া পরিস্থিতির এই বদলে যাওয়া শুধু অস্বস্তিকরই নয়, অনেকের জন্য রীতিমতো কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দেশের আবহাওয়ার বর্তমান চিত্র
টানা কয়েক দিন ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। এক দিনের ব্যবধানে তাপমাত্রা আরও নিচে নেমেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে ঈশ্বরদীতে, মাত্র ৮ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রাজধানী ঢাকায়ও শীতের দাপট কম নয়। এখানে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমেছে ১৩ দশমিক ২ ডিগ্রিতে। এই হঠাৎ তাপমাত্রা পতনের সঙ্গে যোগ হয়েছে কনকনে ঠান্ডা বাতাস, যা শীতের অনুভূতিকে আরও তীব্র করে তুলছে।
শৈত্যপ্রবাহ কতটা বিস্তৃত
বর্তমানে দেশের অন্তত ১৫টি জেলার ওপর দিয়ে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, নারায়ণগঞ্জ, রাজশাহী, ঈশ্বরদী, বগুড়া, দিনাজপুর, যশোর, চুয়াডাঙ্গাসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় ঠান্ডার প্রকোপ স্পষ্ট। আবহাওয়া অধিদপ্তরের মতে, এই শৈত্যপ্রবাহ আপাতত কমার লক্ষণ দেখাচ্ছে না। বরং পরিস্থিতি অনুযায়ী কিছু এলাকায় শীত আরও বাড়তে পারে।
ঘন কুয়াশায় ঢাকা সকাল
শীতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে কুয়াশা। মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত দেশের নদী অববাহিকা ও নিম্নাঞ্চলে মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়ছে। অনেক জায়গায় এই কুয়াশা দুপুর পর্যন্ত কাটছে না। বিশেষ করে উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে ভোরবেলা রাস্তা, ফসলের মাঠ, ঘরবাড়ি সবকিছু কুয়াশার আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে। সকালের ব্যস্ত সময়েও সূর্যের দেখা না মেলায় ঠান্ডার অনুভূতি আরও গভীর হচ্ছে।
কোন কোন অঞ্চলে শীত বেশি
আবহাওয়া বিশ্লেষকদের ধারণা অনুযায়ী, রংপুর, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের জেলাগুলোতে তাপমাত্রা পাঁচ থেকে সাত ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে আসতে পারে। এসব এলাকায় শীতের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে। অন্যদিকে ময়মনসিংহ ও ঢাকা বিভাগের অনেক জেলায়ও সকাল পর্যন্ত সূর্যের দেখা মিলছে না। খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলে তুলনামূলকভাবে একটু আগে সূর্যের আলো দেখা গেলেও কুয়াশার প্রভাব সেখানে কম নয়।
শীত ও কুয়াশা কত দিন থাকবে
আবহাওয়া অধিদপ্তরের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস বলছে, চলমান শৈত্যপ্রবাহ ও কুয়াশা আগামী ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। জানুয়ারি মাসজুড়েই শীতের দাপট থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এই মাসে দুই থেকে তিনটি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মধ্যে এক থেকে দুটি শৈত্যপ্রবাহ তীব্র আকার নিতে পারে, যা জনজীবনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

তাপমাত্রা কমার কারণ কী
বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তর দিক থেকে আসা শুষ্ক ও ঠান্ডা বায়ুপ্রবাহই এই পরিস্থিতির মূল কারণ। এই বাতাস দেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় তাপমাত্রা দ্রুত কমিয়ে দিচ্ছে। একই সঙ্গে আকাশ পরিষ্কার থাকলেও বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকায় ঘন কুয়াশা তৈরি হচ্ছে। দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য কমে যাওয়ায় শীতের অনুভূতি আরও বেশি হচ্ছে।
সাধারণ মানুষের ভোগান্তি
শীতের সবচেয়ে বড় ধাক্কা খাচ্ছেন নিম্নআয়ের মানুষ। দিনমজুর, রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিকরা কনকনে ঠান্ডা ও ঘন কুয়াশার কারণে ভোরে কাজে বের হতে পারছেন না। অনেক জায়গায় কাজের সময় কমে গেছে। ফলে দৈনিক আয়ে টান পড়ছে। শিশু ও বয়স্কদের কষ্ট আরও বেশি। শীতজনিত সর্দি, কাশি ও শ্বাসকষ্টের রোগীর সংখ্যা বাড়ছে হাসপাতালগুলোতে।
উত্তরাঞ্চলের বাস্তব চিত্র
উত্তরাঞ্চলের অনেক এলাকায় খোলা জায়গায় বসবাসকারী মানুষ আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছেন। কুয়াশায় ভেজা সকালে একটুখানি উষ্ণতার জন্য সবাই আগুনের পাশে জড়ো হচ্ছেন। কোথাও কোথাও স্থানীয় উদ্যোগে শীতবস্ত্র বিতরণ শুরু হলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা এখনো অপ্রতুল।
যান চলাচলে সমস্যা
ঘন কুয়াশার বড় প্রভাব পড়েছে সড়ক ও নৌপথে। ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত অনেক সড়কে যান চলাচল ধীর হয়ে যাচ্ছে। দূরপাল্লার বাস ও পণ্যবাহী যান সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছে না। নৌপথেও কুয়াশার কারণে লঞ্চ ও ফেরি চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। এতে যাত্রী ও ব্যবসায়ীরা পড়ছেন বাড়তি ভোগান্তিতে।
কৃষিতে শীতের প্রভাব
শীত ও কুয়াশার প্রভাব কৃষিতেও পড়ছে। কিছু শীতকালীন ফসলের জন্য ঠান্ডা উপকারী হলেও অতিরিক্ত কুয়াশা ফসলের ক্ষতি করতে পারে। বিশেষ করে সবজি ও বোরো ধানের চারা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। কৃষকরা তাই আবহাওয়ার দিকে সতর্ক নজর রাখছেন।
শীত মোকাবিলায় করণীয়
এই সময়টাতে একটু বাড়তি সতর্কতা খুব জরুরি। গরম কাপড় ব্যবহার, শিশু ও বয়স্কদের বিশেষ যত্ন এবং ভোরের ঠান্ডায় অপ্রয়োজনে বাইরে না যাওয়া ভালো। যাদের বাইরে কাজ করতে হয়, তাদের জন্য গরম পোশাক ও হাত-মোজা ব্যবহার শীতজনিত অসুস্থতা থেকে বাঁচাতে পারে।
সামনে কী অপেক্ষা করছে
সব মিলিয়ে বলা যায়, জানুয়ারির বাকি সময়টা শীতের সঙ্গেই কাটতে যাচ্ছে। কুয়াশা ও শৈত্যপ্রবাহ আপাতত বিদায় নিচ্ছে না। আবহাওয়া পরিস্থিতি বুঝে আগেভাগে প্রস্তুতি নিলে এই কঠিন সময়টা কিছুটা হলেও সহনীয় করা সম্ভব। শীত যেমন কষ্ট নিয়ে আসে, তেমনি একটু সচেতনতা আর সহযোগিতায় সেই কষ্ট অনেকটাই কমিয়ে আনা যায়।


