বাংলাদেশজুড়ে শীতের প্রকোপ নতুন করে বাড়তে শুরু করেছে। আবারও তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় উত্তর, মধ্য ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়েছে গ্রাম থেকে শহর—দিনের বেলাতেও অনেক জায়গায় সূর্যের দেখা মিলছে না। ফলে শীতের অনুভূতি আরও তীব্র হয়ে উঠেছে এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় দেখা দিয়েছে চরম ভোগান্তি।
দেশের তাপমাত্রা আরও কমলো, শৈত্যপ্রবাহের বিস্তার ১২ জেলায়
আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা আরও এক ডিগ্রি সেলসিয়াস কমে গেছে। সোমবার রাজশাহী বিভাগের আট জেলা ছাড়াও কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, যশোর ও দিনাজপুরসহ মোট ১২ জেলায় শৈত্যপ্রবাহ বয়ে গেছে। এই শৈত্যপ্রবাহের কারণে রাত ও ভোরের শীত এখন কনকনে রূপ নিয়েছে।
বিশেষ করে উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ বেশি ভুগছেন। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত অনেক এলাকায় দৃশ্যমানতা নেমে এসেছে মাত্র ৫০ থেকে ১০০ মিটারে। কোথাও কোথাও তার চেয়েও কম দূরত্বে কিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না।
ঘন কুয়াশায় ঢাকা দেশ, সূর্যের দেখা মিলছে না
শীত বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখা দিচ্ছে ঘন কুয়াশা। হিমালয় থেকে নেমে আসা শীতল বাতাসের সঙ্গে গঙ্গা অববাহিকা হয়ে ছড়িয়ে পড়া কুয়াশা দেশের উত্তরাঞ্চল থেকে মধ্যাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। এই কুয়াশার কারণে দিনের বেলায় সূর্যের আলো ঠিকমতো পৌঁছাতে পারছে না।
সূর্যের কিরণকাল কমে যাওয়ায় দিনের তাপমাত্রা সামান্য বাড়লেও শীতের অনুভূতি কমছে না। বরং বাতাসে আর্দ্রতা ও পরিবেশদূষণের কারণে ধোঁয়াশা তৈরি হচ্ছে, যা শীতকে আরও বেশি অনুভবযোগ্য করে তুলছে।
সর্বনিম্ন তাপমাত্রার রেকর্ড: ঈশ্বরদীতে ৮.৪ ডিগ্রি
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিমাপ অনুযায়ী, সোমবার দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে পাবনার ঈশ্বরদীতে—মাত্র ৮ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আগের দিন রোববার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে ৯ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
অন্যদিকে রাজধানী ঢাকায় সোমবার তাপমাত্রা আগের দিনের তুলনায় প্রায় এক ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। তবে ঘন কুয়াশা ও বাতাসের কারণে ঢাকাবাসীর শীতের কষ্ট একটুও কমেনি। সকালে বের হলে গরম কাপড় ছাড়া চলাফেরা করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
শীতে বিপর্যস্ত জনজীবন, ব্যাহত যোগাযোগ ব্যবস্থা
তীব্র শীত ও কুয়াশার কারণে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অধিকাংশ এলাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। সকালবেলা অফিসগামী মানুষ, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও দিনমজুররা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন। অনেক এলাকায় যানবাহন চলাচল ধীরগতিতে হচ্ছে।
ঘন কুয়াশার সরাসরি প্রভাব পড়েছে সড়ক ও নৌপথের যোগাযোগ ব্যবস্থায়। দৃশ্যমানতা কম থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে গেছে, ফলে কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে বিভিন্ন রুটে যান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে।
ফেরি চলাচল বন্ধ, পরে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক
রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া-মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া এবং মানিকগঞ্জের আরিচা-পাবনার কাজীরহাট নৌপথে কুয়াশার কারণে ফেরি চলাচল ব্যাহত হয়। দুর্ঘটনার আশঙ্কায় রোববার মধ্যরাতে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া রুটে ফেরি চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়।
প্রায় সাত ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর সোমবার সকাল সোয়া ৭টা থেকে ওই রুটে ফেরি চলাচল আবার শুরু হয়। অন্যদিকে আরিচা-কাজীরহাট রুটে প্রায় ১০ ঘণ্টা ফেরি চলাচল বন্ধ ছিল। সকাল সোয়া ৯টার দিকে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে ফেরি চলাচল পুনরায় চালু করা হয়।
আবহাওয়াবিদদের বিশ্লেষণ: শীত আরও বাড়তে পারে
আবহাওয়াবিদ মো. তরিফুল নেওয়াজ কবীর জানিয়েছেন, বর্তমানে শৈত্যপ্রবাহের পরিধি কিছুটা বেড়েছে এবং সামগ্রিকভাবে দেশের তাপমাত্রা কমেছে। তবে আগামী মঙ্গলবার ও বুধবার তাপমাত্রা সামান্য বাড়তে পারে। এরপর আবারও তাপমাত্রা কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্য আবহাওয়াবিদ হাফিজুর রহমানের মতে, গঙ্গা অববাহিকা হয়ে ঘন কুয়াশা বিস্তৃত থাকায় শীতের তীব্রতা বেড়েছে। কুয়াশার কারণে দিনের বেলায় সূর্যের আলো কম পাচ্ছে দেশ। এর সঙ্গে পরিবেশদূষণ যুক্ত হয়ে ধোঁয়াশা তৈরি করছে, যা শীতকে আরও দীর্ঘস্থায়ী ও কষ্টকর করে তুলছে।
আপাতত স্বস্তির সম্ভাবনা কম, সতর্ক থাকার পরামর্শ
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, আপাতত কুয়াশা ও শীত থেকে দ্রুত স্বস্তির আশা খুব বেশি নেই। দিনে তাপমাত্রা সাময়িকভাবে কিছুটা বাড়লেও যদি সূর্যের দেখা না মেলে, তাহলে কনকনে শীত আরও কয়েক দিন অব্যাহত থাকতে পারে।
বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের এই সময়ে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ভোর ও রাতে প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না যাওয়া, গরম পোশাক ব্যবহার এবং কুয়াশার সময় সড়ক ও নৌপথে চলাচলে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে বলা যায়, দেশের শীত এখনো পুরোপুরি বিদায় নিচ্ছে না। বরং শৈত্যপ্রবাহ ও ঘন কুয়াশা মিলিয়ে আগামী কয়েক দিন জনজীবনে আরও ভোগান্তি বাড়াতে পারে।


