কাশ্মীরকে ভূস্বর্গ বলা হয় কারণ এখানকার প্রকৃতি সব সময় চমকে দেয়। কখনও সবুজ উপত্যকা, কখনও রুপোলি পাহাড়, আবার কখনও সাদা বরফে মোড়া স্বপ্নের মতো দৃশ্য। এবার সেই রূপ আরও নাটকীয় হতে চলেছে। চিল্লাই কলনের শেষের দিকে এসে জোড়া পশ্চিমী ঝঞ্ঝার প্রভাবে কাশ্মীরের চেহারা একেবারে বদলে যেতে চলেছে। পাহাড়, উপত্যকা, মাঠ, বনাঞ্চল—সবকিছু ঢেকে যাবে বরফের মোটা চাদরে।
চিল্লাই কলন কী এবং কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
কাশ্মীরের শীত মানেই চিল্লাই কলন। এটি বছরের সবচেয়ে কঠিন শীতের সময়। মোট ৪০ দিনের এই পর্বে ঠান্ডা এমন মাত্রায় পৌঁছয় যে জল জমে বরফ হয়, নদীর গতি ধীর হয়ে যায়, আর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়ে। সাধারণত এই সময়ে তুষারপাত হলে ঠান্ডা আরও তীব্র হয়। তবে এবার চিল্লাই কলনের বেশিরভাগ সময় কাশ্মীর কাটিয়েছে শুকনো শীতে।
পশ্চিমী ঝঞ্ঝার অনুপস্থিতির কারণে উপত্যকায় বৃষ্টি বা তুষারপাত কম হয়েছে। আকাশ পরিষ্কার থাকলেও ঠান্ডা ছিল হাড়কাঁপানো। রাতের তাপমাত্রা নেমে গিয়েছে অনেক নিচে। মানুষ আগুন জ্বালিয়ে, ভারী পোশাক পরে ঠান্ডার সঙ্গে লড়াই করেছে।
শুকনো শীতের অবসান, ভিজে ঠান্ডার শুরু
এবার সেই চিত্র বদলাতে চলেছে। চিল্লাই কলনের শেষ লগ্নে অবশেষে কাশ্মীর পেতে চলেছে বহু প্রতীক্ষিত তুষারপাত। ২২ জানুয়ারি থেকে একটি শক্তিশালী পশ্চিমী ঝঞ্ঝা জম্মু ও কাশ্মীরে প্রবেশ করবে। এর প্রভাবে টানা তুষারপাত এবং ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এই পরিবর্তনের ফলে শুকনো ঠান্ডার জায়গা নেবে ভিজে ঠান্ডা। যারা কাশ্মীরে থেকেছেন, তারা জানেন ভিজে ঠান্ডা কতটা কষ্টকর। কাপড় ভিজে যায়, রাস্তা পিচ্ছিল হয়ে ওঠে, আর দৈনন্দিন কাজকর্মে বিঘ্ন ঘটে।
প্রথম পশ্চিমী ঝঞ্ঝার দাপট: ২২ থেকে ২৪ জানুয়ারি
২২ জানুয়ারি থেকে শুরু হয়ে ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রথম পশ্চিমী ঝঞ্ঝার প্রভাব সবচেয়ে বেশি থাকবে। বিশেষ করে ২৩ জানুয়ারি পরিস্থিতি সবচেয়ে কঠিন হতে পারে। আবহাওয়া দফতরের ইঙ্গিত অনুযায়ী এই সময় প্রবল তুষারপাতের কবলে পড়বে পীরপাঞ্জাল রেঞ্জ এবং চেনাব ভ্যালি।
এছাড়াও সোনমার্গ, গুলমার্গ, পহেলগাম, সোপিয়ান, অনন্তনাগ, কিস্তওয়ার, রামবান সহ বিস্তীর্ণ এলাকা সাদা বরফে ঢেকে যাবে। অনেক নিচু এলাকায় ভারী বৃষ্টি হবে। সঙ্গে বইবে ঝোড়ো হাওয়া, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে।
পর্যটন ও যাতায়াতে বড় প্রভাব
এই তুষারপাত কাশ্মীরের সৌন্দর্য বাড়ালেও এর সঙ্গে আসে সমস্যা। পাহাড়ি রাস্তায় তুষার জমলে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যেতে পারে। জাতীয় সড়কগুলিতে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করা হতে পারে। অনেক জায়গায় বিদ্যুৎ পরিষেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
তবে পর্যটকদের জন্য এটি হতে পারে সুখবর। বরফে ঢাকা গুলমার্গ বা সোনমার্গ দেখতে বহু পর্যটক এই সময় কাশ্মীরে আসেন। স্কিইং, স্নোফল উপভোগ—সব মিলিয়ে শীতকালীন পর্যটন নতুন গতি পেতে পারে।
দ্বিতীয় পশ্চিমী ঝঞ্ঝা: তুলনামূলক দুর্বল, তবু প্রভাবশালী
প্রথম ঝঞ্ঝার রেশ কাটতে না কাটতেই ২৬ জানুয়ারি ফের একটি পশ্চিমী ঝঞ্ঝা কাশ্মীরে প্রবেশ করবে। যদিও এটি প্রথমটির মতো শক্তিশালী নয়, তবুও এর প্রভাবে বৃষ্টি ও তুষারপাত হবে। ২৬ থেকে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত এর প্রভাব বজায় থাকবে। ২৭ জানুয়ারি পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এর ফলে আগেই জমে থাকা বরফের উপর নতুন বরফ পড়বে। এতে ঠান্ডা আরও বাড়বে এবং দৈনন্দিন জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
চিল্লাই কলনের শেষে আবহাওয়ার বড় বদল
৩০ জানুয়ারি চিল্লাই কলন শেষ হবে। তার আগেই কাশ্মীর একেবারে অন্য রূপ নেবে। দীর্ঘ শুকনো শীতের পর টানা বৃষ্টি ও তুষারপাত কাশ্মীরের প্রকৃতিকে নতুনভাবে সাজিয়ে তুলবে। পাহাড় আরও সাদা হবে, উপত্যকা ঢেকে যাবে বরফে, আর নদী-ঝরনাগুলি নতুন প্রাণ পাবে।
এই পরিবর্তন শুধু সৌন্দর্যের দিক থেকেই নয়, পরিবেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তুষারপাত গ্রীষ্মকালের জলসঙ্কট কমাতে সাহায্য করে। পাহাড়ে জমা বরফ ধীরে ধীরে গলে নদীতে জল জোগায়।
সাধারণ মানুষের প্রস্তুতি কতটা জরুরি
এই আবহাওয়া পরিবর্তনের সময় সাধারণ মানুষের সতর্ক থাকা খুব জরুরি। ভারী তুষারপাতের সময় অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়ানো উচিত। পর্যাপ্ত গরম পোশাক, শুকনো খাবার এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ মজুত রাখা দরকার। প্রশাসনের নির্দেশ মানলে অনেক বিপদ এড়ানো সম্ভব।
চিল্লাই কলনের শেষ পর্বে জোড়া পশ্চিমী ঝঞ্ঝা কাশ্মীরকে আবারও তার চেনা শীতকালীন রূপে ফিরিয়ে আনছে। একদিকে বাড়ছে ঠান্ডার দাপট, অন্যদিকে বাড়ছে প্রকৃতির সৌন্দর্য। সাদা বরফে মোড়া ভূস্বর্গ আবারও প্রমাণ করবে কেন কাশ্মীরকে এত ভালোবাসে মানুষ। আবহাওয়ার এই নাটকীয় বদল কাশ্মীরের ইতিহাসে আরও এক শীতকালকে স্মরণীয় করে রাখবে।


