পৌষ মাসের শুরু হতেই ধীরে ধীরে সারাদেশে জেঁকে বসেছে শীত। সময় যত এগোচ্ছে, ততই বাড়ছে ঠাণ্ডার দাপট। বিশেষ করে উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শীত এখন কনকনে রূপ নিয়েছে। হিমেল হাওয়া, ঘন কুয়াশা আর কমতে থাকা তাপমাত্রায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা হয়ে পড়েছে কঠিন।
বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে গোপালগঞ্জে। সেখানে তাপমাত্রা নেমে এসেছে মাত্র ৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। তীব্র শীতের সঙ্গে বইছে হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডা বাতাস, যা সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
গোপালগঞ্জে তীব্র শীত ও হিমেল হাওয়ার প্রভাব
গোপালগঞ্জে শীতের প্রকোপ এবার একটু বেশিই অনুভূত হচ্ছে। ভোরের দিকে ঘন কুয়াশায় ঢেকে যাচ্ছে পুরো এলাকা। রাস্তা, গাছপালা, মাঠ—সবকিছু যেন কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। সকাল বেলা সূর্যের দেখা মিললেও তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হচ্ছে না। নিভুনিভু রোদে শীতের তীব্রতা একটুও কমছে না।
স্থানীয়রা বলছেন, এত কম তাপমাত্রা আগে খুব একটা দেখা যায়নি। ঠাণ্ডা বাতাসের কারণে দিনের বেলাতেও গরম কাপড় ছাড়া বাইরে বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শীতের দাপট বাড়ছে
শুধু গোপালগঞ্জ নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ধীরে ধীরে কমছে তাপমাত্রা। উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে হিমেল হাওয়ার দাপটে শীত আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। কুড়িগ্রাম, পঞ্চগড়, নীলফামারী, রাজশাহী, যশোরসহ অনেক জেলায় রাত ও ভোরে তাপমাত্রা দ্রুত নেমে যাচ্ছে।
কুয়াশার কারণে সকালবেলা যান চলাচলেও দেখা দিচ্ছে সমস্যা। অনেক এলাকায় সড়কে গাড়ির গতি কমিয়ে চালাতে হচ্ছে। নদীপথেও কুয়াশার প্রভাব পড়ছে, ফলে লঞ্চ ও নৌযান চলাচলে সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।
কুয়াশা ও ঠাণ্ডা বাতাসে ব্যাহত স্বাভাবিক জীবন
ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত ঘন কুয়াশা চারপাশ ঢেকে রাখছে। দূরের কিছুই পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না। ঠাণ্ডা বাতাসের সঙ্গে এই কুয়াশা মিলেমিশে শীতকে আরও অসহনীয় করে তুলছে।
অনেক এলাকায় স্কুলগামী শিশুদের সকালে বের হতে কষ্ট হচ্ছে। অভিভাবকরা চিন্তিত হয়ে পড়ছেন তাদের সন্তানদের স্বাস্থ্য নিয়ে। গ্রামের মানুষ সকালবেলা আগুন জ্বালিয়ে বা খড়কুটো পুড়িয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছেন।
প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হচ্ছেন না মানুষ
তীব্র শীতের কারণে সাধারণ মানুষ প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হচ্ছে না। বিশেষ করে সকাল ও রাতের দিকে রাস্তাঘাট অনেকটাই ফাঁকা থাকছে। দোকানপাট খুলতে দেরি হচ্ছে, বাজারেও লোকসমাগম কম দেখা যাচ্ছে।
তবে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন খেটে খাওয়া মানুষ। দিনমজুর, রিকশাচালক, ভ্যানচালক ও কৃষিশ্রমিকদের কাজের সুযোগ কমে গেছে। ঠাণ্ডার কারণে অনেকেই কাজে যেতে পারছেন না, ফলে আয়েও প্রভাব পড়ছে।
ছিন্নমূল ও অসহায় মানুষের দুর্ভোগ চরমে
শীতের সবচেয়ে বড় আঘাতটা গিয়ে লাগছে ছিন্নমূল ও অসহায় মানুষের ওপর। ফুটপাতে, রেলস্টেশনে কিংবা খোলা জায়গায় থাকা মানুষদের জন্য এই ঠাণ্ডা যেন এক ভয়ংকর পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
অনেকের কাছে পর্যাপ্ত গরম কাপড় নেই। রাতে কনকনে ঠাণ্ডায় তারা খোলা আকাশের নিচে কাঁপতে কাঁপতে রাত কাটাচ্ছেন। স্থানীয়ভাবে কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও ব্যক্তি উদ্যোগে শীতবস্ত্র বিতরণ শুরু হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল।
শীতের সঙ্গে বাড়ছে ঠাণ্ডাজনিত রোগ
শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে ঠাণ্ডাজনিত রোগের প্রকোপ। সর্দি, কাশি, জ্বর, নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টের রোগী বাড়ছে হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্করা বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন।
চিকিৎসকরা বলছেন, এই সময় গরম কাপড় ব্যবহার, কুসুম গরম পানি পান এবং সকাল ও রাতের ঠাণ্ডা এড়িয়ে চলা খুব জরুরি। শিশুদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন, কারণ তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক কম।
কৃষিতে শীতের প্রভাব
শীতের এই তীব্রতা কৃষিতেও প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। কিছু এলাকায় শীতকালীন সবজির জন্য এই ঠাণ্ডা উপকারী হলেও ঘন কুয়াশা ও ঠাণ্ডা বাতাস বোরো ধানের বীজতলা ও অন্যান্য ফসলের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
কৃষকরা জানান, কুয়াশা দীর্ঘস্থায়ী হলে ফসলে রোগবালাইয়ের আশঙ্কা বাড়ে। তাই তারা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
আগামী দিনগুলোতে শীত আরও বাড়তে পারে
আবহাওয়াবিদদের মতে, সামনে আরও কয়েকদিন শীতের তীব্রতা বাড়তে পারে। রাতের তাপমাত্রা আরও কমার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে মাঝারি থেকে তীব্র শৈত্যপ্রবাহের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
এ কারণে সবাইকে আগেভাগে প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। গরম কাপড় ব্যবহার, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং স্বাস্থ্য সচেতনতা বজায় রাখাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
শীতে সতর্কতা ও মানবিক সহায়তার প্রয়োজন
এই শীত শুধু প্রকৃতির এক রূপ নয়, এটি আমাদের মানবিক দায়িত্বও মনে করিয়ে দেয়। যারা গরম ঘরে আরাম করে শীত কাটাচ্ছেন, তাদের উচিত অসহায় মানুষগুলোর কথা ভাবা।
একটি কম্বল, একটি গরম জামা কিংবা একটু সহানুভূতিই কারও শীতের রাত সহজ করে দিতে পারে। শীতের এই সময়ে মানবিকতা আর সহযোগিতাই হতে পারে সবচেয়ে বড় উষ্ণতা।


