পৌষ সংক্রান্তি এলেই বাঙালির রসনায় ফেরে এক অনন্য স্বাদ—নলেন গুড়। সেই সোনালি তরল দিয়েই তৈরি হয় জয়নগরের মোয়া, পুলি-পিঠে, পায়েস, সন্দেশ, এমনকি আধুনিক আইসক্রিমও। খেজুরের রস থেকে তৈরি এই গুড় শুধু স্বাদের জন্য নয়, পুষ্টিগুণের জন্যও বিখ্যাত। এতে রয়েছে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, আয়রনসহ নানা উপাদান, যা হজমে সহায়ক, ত্বক ভালো রাখে এবং শরীরকে শক্তি জোগায়। কিন্তু এই স্বাস্থ্যকর খাদ্যই এখন জঙ্গলমহলে তৈরি হচ্ছে চরম অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে। প্রশ্ন উঠছে—এই নলেন গুড় আদৌ কতটা নিরাপদ?
খেজুর গুড়ের আড়ালে ভয়ংকর বাস্তবতা
পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গলমহল, বিশেষ করে পুরুলিয়া জেলা, খেজুর গাছের জন্য পরিচিত। ভাদ্র মাস থেকেই ভিন জেলা—নদিয়া, বর্ধমান, বাঁকুড়া—থেকে শিউলিরা এসে খেজুর রস সংগ্রহ ও নলেন গুড় তৈরির কাজ শুরু করেন। বছরের পর বছর ধরে এই গুড় রাজ্যের গণ্ডি পেরিয়ে ‘বিশ্ব বাংলা’-র স্টলের মাধ্যমে দেশের নানা প্রান্তে জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
কিন্তু বাস্তব চিত্রটি ভয় ধরানোর মতো। পুরুলিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা অস্থায়ী তাঁবুতে যেভাবে খেজুর রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরি হচ্ছে, তা দেখে আতঙ্কিত হচ্ছেন সচেতন মহল।
খোলা কড়াই, মাছির ভনভন আর ধুলোর আস্তরণ
পেল্লাই সাইজের কড়াইতে খেজুরের রস জাল দেওয়া হচ্ছে খোলা আকাশের নিচে। জ্বালানি শেষ হয়ে গেলে আগুন নিভে যাচ্ছে মাঝপথেই। সেই অবস্থাতেই পর্যটক ও পথচলতি মানুষের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে আধা-তৈরি বা তৈরি গুড়। চারপাশে ভনভন করছে মাছি, পাশেই ঘুরে বেড়াচ্ছে মুরগি।
ঠিক সেই সময় পাশের রাস্তায় পাথর বোঝাই লরি চলাচল করছে। ধুলো উড়ে এসে সরাসরি পড়ছে উনুনে বসানো গুড়ের কড়াইয়ে। কোথাও কোনও ঢাকনা নেই, নেই ন্যূনতম সুরক্ষা ব্যবস্থা।
খেজুর রসের হাঁড়িতে পাখির মুখ-মল!
সবচেয়ে ভয়ংকর চিত্র দেখা যাচ্ছে খেজুর রস সংগ্রহের ক্ষেত্রে। গাছে বাঁধা প্লাস্টিকের কৌটো বা হাঁড়ির চারপাশে জমে রয়েছে পাখির বিষ্ঠা। দুর্গন্ধে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকাই দায়। টিয়া, ময়না, বুলবুলি, কাজললতা থেকে শুরু করে কাক পর্যন্ত ঠোঁট দিচ্ছে ওই হাঁড়িতে। শুধু রসের স্বাদ নেওয়াই নয়, সরাসরি রসে মিশছে পাখিদের মুখের বর্জ্য ও বিষ্ঠা।
এই দূষণ ঠেকাতে অনেক শিউলি হাঁড়ির ভেতরে চুন ব্যবহার করছেন। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—এই চুন কি আদৌ খাবার উপযোগী? বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি পানে ব্যবহৃত চুন নয়। ফলে জীবাণুমুক্ত হওয়ার বদলে আরও বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
অস্থায়ী তাঁবুতে রান্না, পাশে আবর্জনা আর ইঁদুর
শিউলিদের অস্থায়ী তাঁবুর ভেতরের পরিস্থিতিও ভয়াবহ। কাগজে মোড়া বস্তার ওপর পাটালির পাশে রান্নার কাজ চলছে। সেখানেই ফেলা হচ্ছে জল, সবজির খোসা, অন্যান্য আবর্জনা। চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে মেঠো ইঁদুর। এই পরিবেশে তৈরি হওয়া গুড় সরাসরি বাজারে বিক্রি হচ্ছে।
দামও কম নয়। নলেন গুড় বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১২০ থেকে ১৫০ টাকায়। পাটালি গুড়ের দাম ১০০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত। পর্যটক থেকে স্থানীয় মানুষ—সবাই নির্বিঘ্নে কিনে নিচ্ছেন এই গুড়, না জেনেই সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা।
খাদ্য সুরক্ষা বিভাগ কোথায়? অভিযোগে উদাসীনতা
এতকিছুর পরও সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—খাদ্য সুরক্ষা বিভাগ কী করছে? অভিযোগ উঠেছে, পুরুলিয়া জেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দপ্তরের খাদ্য সুরক্ষা বিভাগ কার্যত নিষ্ক্রিয়। যদিও জেলার কাছে ভ্রাম্যমাণ খাদ্য সুরক্ষা গাড়ি রয়েছে, তবুও এই অস্থায়ী তাঁবুগুলিতে কখনও অভিযান চালানো হয়নি বলে অভিযোগ।
ফলত কোনও ভয় বা নজরদারি ছাড়াই বেপরোয়া ভাবে চলেছে খেজুর গুড় তৈরির কাজ।
জনবল সংকটে নজরদারি ভেঙে পড়েছে
পুরুলিয়া জেলার ২০টি ব্লকের জন্য মাত্র ৯ জন খাদ্য সুরক্ষা আধিকারিক রয়েছেন। একজন আধিকারিককে একসঙ্গে দুই বা তিনটি ব্লকের দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে প্রত্যন্ত এলাকায় ছড়িয়ে থাকা শিউলিদের তাঁবুতে নিয়মিত নজরদারি কার্যত অসম্ভব।
খাদ্য সুরক্ষার নোডাল আধিকারিক ও উপ-মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক-২ মহুয়া মাহান্তির সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
আধিকারিকদের প্রতিক্রিয়া: আশ্বাসই সার
পুরুলিয়া শহর, পুরুলিয়া-১ ও পুরুলিয়া-২ ব্লকের দায়িত্বপ্রাপ্ত খাদ্য সুরক্ষা আধিকারিক আরিফুল হক জানান, তিনি বর্তমানে ছুটিতে রয়েছেন। কাজে যোগ দেওয়ার পর শিউলিদের অস্থায়ী তাঁবুতে যাবেন বলে আশ্বাস দেন।
অন্যদিকে জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক অশোক বিশ্বাস বলেন, “এই বিষয়ে প্রথমে সচেতনতা জরুরি। সত্যিই এমন হওয়া উচিত নয়। বিষয়টি জেলা প্রশাসনের নজরে এনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হবে।”
শিউলিদের যুক্তি, কিন্তু দায় এড়ানো যায় না
শিউলিদের বক্তব্যেও উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য। হুড়া থানা এলাকার শিউলি কুদ্দুস মল্লিক বলেন, “নোংরা আটকাতেই আমরা হাঁড়িতে চুন দিই, যাতে খেজুর রস জীবাণুমুক্ত থাকে।” এই বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট, পাখির বর্জ্য যে সরাসরি রসে পড়ছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
আরেক শিউলি আব্দুল মজিদ বলেন, “মাঠে-ঘাটেই তাঁবু করে থাকতে হয়। সব হাঁড়িতে জাল দেওয়া সম্ভব নয়।” কিন্তু তাই বলে কি স্বাস্থ্যবিধি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা যায়?
জাল দিলেই কি সমস্যা মিটত না?
বিশেষজ্ঞদের মতে, গাছে বাঁধা হাঁড়ির ওপরে জাল ব্যবহার করলে অনেকটাই দূষণ রোধ করা সম্ভব। সামান্য ছিদ্রযুক্ত জাল দিয়েও খেজুরের রস সহজেই হাঁড়িতে পড়তে পারে। অথচ সেই সহজ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। ফলে পাখি, ধুলো, জীবাণু—সব মিলেই নলেন গুড় হয়ে উঠছে এক ভয়ংকর স্বাস্থ্যঝুঁকির উৎস।
স্বাস্থ্যবিধি মানাবে কে?
জঙ্গলমহলের নলেন গুড় শুধু একটি খাদ্যপণ্য নয়, এটি বাংলার ঐতিহ্য। কিন্তু সেই ঐতিহ্যই আজ প্রশ্নের মুখে। খেজুর রসের হাঁড়িতে পাখির বিষ্ঠা, গুড়ে অখাদ্য চুন, খোলা আকাশের নিচে রান্না—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ভয়াবহ।
সবচেয়ে বড় সমস্যা, নিয়মিত অভিযান ও নজরদারির অভাব। খাদ্য সুরক্ষা বিভাগ কার্যকর না হলে শিউলিরাও নিয়ম মানতে আগ্রহী হবেন না। ফলে প্রশ্ন একটাই—এই স্বাস্থ্যবিধি দেখবে কে?
যদি এখনই কড়া পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে নলেন গুড়ের বদনাম শুধু রাজ্যেই নয়, দেশের বাইরেও ছড়িয়ে পড়বে। আর তার খেসারত দিতে হবে সাধারণ মানুষকেই—স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে।


