কলকাতায় বাংলাদেশের উপদূতাবাসকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনা নতুন করে সামনে এসেছে। একই দিনে প্রথমে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর মিছিল ও বিক্ষোভের পর সন্ধ্যায় বামপন্থি দলগুলোর নেতাকর্মীরা আলাদা মিছিল নিয়ে রাস্তায় নামেন। এই ঘটনাকে ঘিরে শহরের রাজনৈতিক পরিবেশ যেমন উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, তেমনি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
দুপুরের বিক্ষোভের পর সন্ধ্যায় বামপন্থি মিছিল
দিনের শুরুতে কলকাতায় ডেপুটি হাইকমিশন কার্যালয়ের সামনে হিন্দুত্ববাদী কয়েকটি সংগঠন বিক্ষোভে অংশ নেয়। পুলিশের ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা, ধাক্কাধাক্কি এবং শেষ পর্যন্ত লাঠিচার্জ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়। এই ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর সন্ধ্যায় বামপন্থি দলগুলো একই এলাকায় মিছিলের ডাক দেয়।
তবে দুপুরের ঘটনার পুনরাবৃত্তি সন্ধ্যায় দেখা যায়নি। বামপন্থি নেতাকর্মীরা পুলিশের ব্যারিকেডের সামনে পৌঁছালেও তা ভাঙার কোনো চেষ্টা করেননি। প্রায় দুশো মিটার দূরেই তাদের মিছিল থামিয়ে দেওয়া হয় এবং শান্তিপূর্ণভাবেই কর্মসূচি শেষ হয়।
কোন কোন দল অংশ নিয়েছিল মিছিলে
এই মিছিলে অংশ নেয় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) বা সিপিআই (এম), সিপিআই, বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী দল (আরএসপি), একতা দল এবং ফরোয়ার্ড ব্লকের নেতাকর্মীরা। দীর্ঘদিন ধরেই এই দলগুলো নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির দাবিদার হিসেবে তুলে ধরে আসছে। বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে তাদের উদ্বেগ ও প্রতিবাদ সেই রাজনৈতিক অবস্থানেরই অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বক্তৃতায় উঠে আসে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্ন
মিছিল শেষে বামপন্থি নেতারা বক্তব্য দেন। তাদের বক্তৃতার মূল সুর ছিল বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে ধর্মীয় মৌলবাদের উত্থানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। তারা দাবি করেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন বেড়েছে এবং একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর স্বাধীনতার ওপর আঘাত আসছে।
নেতারা স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ধর্মান্ধতার জবাবে আরেক ধরনের ধর্মান্ধতা কখনোই সমাধান হতে পারে না। বরং এতে সমাজ আরও বিভক্ত হয় এবং গণতান্ত্রিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে।
মুহাম্মদ সেলিমের বক্তব্য ও তার তাৎপর্য
সিপিআই (এম)-এর রাজ্য সম্পাদক মুহাম্মদ সেলিম এই মিছিল প্রসঙ্গে বলেন, বাংলাদেশে যা ঘটছে তা আসলে একটি সেকুলার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ওপর সরাসরি আক্রমণ। তার ভাষায়, মুক্ত চিন্তা, স্বাধীন মত প্রকাশ এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রতীকগুলো আজ হুমকির মুখে।
তিনি আরও বলেন, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি সমাজকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। এই প্রবণতা শুধু বাংলাদেশে নয়, ভারতেও দেখা যাচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, দুই দেশেই এই ধরনের রাজনীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো জরুরি।
সংখ্যালঘু নির্যাতন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা
বামপন্থি নেতাদের বক্তব্যে একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা। তারা বলেন, কোনো দেশই প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক হতে পারে না যদি সেখানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে বাস করে।
একই সঙ্গে তারা সংবাদমাধ্যমের ওপর হামলা এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর কর্মকাণ্ডে বাধা দেওয়ার ঘটনাগুলোর তীব্র নিন্দা জানান। তাদের মতে, গণতন্ত্রের মেরুদণ্ড হলো স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মুক্ত সংস্কৃতি। এই দুই ক্ষেত্র আক্রান্ত হলে রাষ্ট্রের ভিত্তিই নড়বড়ে হয়ে যায়।
পুলিশের প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা
ডেপুটি হাইকমিশনের আশপাশে পুলিশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল চোখে পড়ার মতো। দুপুর থেকেই তিন স্তরের ব্যারিকেড বসানো হয়। সন্ধ্যার মিছিলে পুলিশ আরও সতর্ক ভূমিকা নেয়, যাতে কোনো ধরনের সংঘর্ষ বা বিশৃঙ্খলা না ঘটে।
বামপন্থি মিছিল শান্তিপূর্ণ থাকায় পুলিশের পক্ষ থেকেও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হয়নি। এতে স্পষ্ট হয় যে, সংগঠিত ও নিয়ন্ত্রিত প্রতিবাদ কর্মসূচি কীভাবে সহিংসতা ছাড়াই সম্পন্ন করা যায়।
একই দিনে দুই ভিন্ন রাজনৈতিক ছবি
একই দিনে একই জায়গায় দুটি ভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি কলকাতার রাজনীতিতে এক বিরল চিত্র তৈরি করে। দুপুরে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর আক্রমণাত্মক বিক্ষোভ এবং সন্ধ্যায় বামপন্থিদের শান্তিপূর্ণ মিছিল—এই দুই বিপরীত দৃশ্য রাজনৈতিক মতাদর্শের পার্থক্যকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
এই ঘটনা প্রমাণ করে, প্রতিবাদের ভাষা ও পদ্ধতি রাজনীতির চরিত্র নির্ধারণে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে এই মিছিল
বাংলাদেশের উপদূতাবাসকে কেন্দ্র করে এমন মিছিল নিঃসন্দেহে কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। বামপন্থি দলগুলো দাবি করেছে, তাদের প্রতিবাদ বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে নয়, বরং সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে।
তারা মনে করে, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা টিকিয়ে রাখতে হলে দুই দেশেই ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধকে শক্তিশালী করতে হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিভঙ্গি
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মিছিল বামপন্থি রাজনীতির জন্য একটি বার্তা বহন করে। দীর্ঘদিন ধরে কোণঠাসা অবস্থায় থাকা বাম রাজনীতি আবারও জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করার চেষ্টা করছে।
বিশেষ করে বাংলাদেশ প্রসঙ্গকে সামনে এনে তারা ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্রের প্রশ্নকে নতুন করে আলোচনায় আনতে চাইছে।


