বর্তমান ডিজিটাল যুগে বিয়ের পাত্র-পাত্রী খুঁজতে ম্যাট্রিমনি সাইটের উপর মানুষের নির্ভরতা ক্রমেই বাড়ছে। কিন্তু এই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে প্রতারণার ঘটনা দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া এয়ারপোর্ট থানার ঘটনায় তা আবারও প্রমাণিত হলো। ঘনিষ্ঠতার নামে হোটেলে ডেকে এক বাঙালি যুবকের সর্বস্ব লুট করে নেয় এক তরুণী এবং তার বাংলাদেশি সঙ্গী।
ঘনিষ্ঠতার ফাঁদ: কীভাবে শুরু হলো প্রতারণা
এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত যুবক বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়ে একটি জনপ্রিয় ম্যাট্রিমনি সাইটে নিজের ছবি আপলোড করেন। সেখানেই পরিচয় হয় এক তরুণীর সঙ্গে।
প্রথমে নিয়মিত কথোপকথন, তারপর বন্ধুত্ব ও ঘনিষ্ঠতা—সবকিছুই চলছিল স্বাভাবিক। এরপর তারা একে অপরের সঙ্গে দেখা করার সিদ্ধান্ত নেন। ২৭ জুলাই, এয়ারপোর্ট আড়াই নম্বর গেটের কাছাকাছি এক হোটেলে প্রথম দেখা করার পরিকল্পনা হয়।
কফির কাপে অচেতনতা: কীভাবে ঘটলো লুটপাট
যুবক যখন হোটেলে তরুণীর সঙ্গে দেখা করতে যান, তখন সবকিছুই ছিল স্বাভাবিক। একপর্যায়ে যুবককে শৌচাগারে যেতে বলেন তরুণী। সেই সুযোগে তরুণী হোটেল রুমেই কফি তৈরি করেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, কফিতে মিশিয়ে দেওয়া হয় অজ্ঞান করার উপাদান। যুবক কফি খাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই অসুস্থ বোধ করেন এবং অচৈতন্য হয়ে পড়েন। এরপর কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়ে থাকেন তিনি। যখন জ্ঞান ফেরে, তখন তিনি দেখেন—তার মোবাইল, টাকা, ব্যাগ সব কিছুই উধাও। তরুণীরও কোনও চিহ্ন নেই।
প্রথম প্রতিক্রিয়া: পুলিশের দ্বারস্থ যুবক
যুবক তখনই হোটেল কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানান। পরে এয়ারপোর্ট থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন তিনি। পুলিশের পক্ষ থেকে সঙ্গে সঙ্গে তদন্ত শুরু হয়।
হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে তরুণীর চেহারা এবং কার্যকলাপ বিশ্লেষণ করা হয়। পাশাপাশি, যুবকের কাছ থেকে পাওয়া ফোন নম্বর ব্যবহার করে পুলিশের একাধিক আধিকারিক পাত্র সেজে তরুণীর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন।
প্রতারকদের গ্রেপ্তার ও তদন্তের অগ্রগতি
টাওয়ার লোকেশন ট্র্যাক করে অবশেষে তরুণীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাকে জেরা করে বেরিয়ে আসে আরেক যুবকের নাম, যিনি আসলে বাংলাদেশের নাগরিক।
পরে দমদম ক্যান্টনমেন্ট এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার কাছ থেকে পাওয়া গেছে বাংলাদেশি পাসপোর্ট, ভিসা সহ গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র।
তরুণী পুলিশের জেরায় স্বীকার করেছেন, লুট করা জিনিসপত্র সে ওই বাংলাদেশি যুবকের হাতে তুলে দিত, এবং সেই যুবক তা নিয়ে বাংলাদেশে চলে যেত।
ম্যাট্রিমনি সাইটে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
এই ঘটনায় আবারও প্রমাণিত হলো, ম্যাট্রিমনি সাইটগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা দুর্বল। ব্যবহারকারীদের যাচাই-বাছাই না করেই সদস্যপদ প্রদান, পরিচয় নিশ্চিত না করেই যোগাযোগের সুযোগ—এসবই প্রতারকদের জন্য খুলে দিচ্ছে নতুন দরজা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের ওয়েবসাইটগুলোর কেওয়াইসি (Know Your Customer) ব্যবস্থা আরও জোরদার করা জরুরি। প্রতিটি প্রোফাইলকে যাচাই করার জন্য আধার, পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্রের মতো নথি জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত।
আন্তঃদেশীয় চক্রের ছায়া: বাংলাদেশি যুবকের যোগসূত্র
তদন্তে উঠে এসেছে আরও ভয়ঙ্কর চিত্র। গ্রেপ্তার হওয়া যুবক শুধুই এই ঘটনার নয়, বরং বহু প্রতারণা চক্রের সঙ্গে যুক্ত। পুলিশ সন্দেহ করছে, বাংলাদেশ থেকে এসে ভারতের বিভিন্ন শহরে এই ধরনের অপরাধ ঘটিয়ে তারা পণ্য ও অর্থ পাচার করে দেয়।
তদন্তকারীরা এখন খতিয়ে দেখছেন, এই প্রতারণা চক্রের সঙ্গে আরও কতজন বাংলাদেশি ও ভারতীয় নাগরিক জড়িত।


