ভারতের রাজধানী দিল্লির লাগোয়া গুরুগ্রাম—যেখানে বহু বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গের হাজার হাজার শ্রমিক জীবিকা নির্বাহ করছেন। কেউ নির্মাণ শ্রমিক, কেউ গাড়ি ধোয়ার কাজ করেন, কেউ ফুড ডেলিভারি বয়ের চাকরি করেন—এদের বড় অংশই মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ, যারা মালদা, মুর্শিদাবাদ, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার মতো সীমান্তবর্তী অঞ্চলের বাসিন্দা।এ খবর বিবিসি বাংলা।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে গুরুগ্রামে দেখা দিয়েছে এক ভয়াবহ আতঙ্ক। স্থানীয় পুলিশের ‘বাংলাদেশি ধরো অভিযান’-এর জেরে আটকের ভয়ে একের পর এক পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান শ্রমিক ঘরছাড়া হচ্ছেন। কেউ ট্রেনের টিকিটের আশায় বসে আছেন, কেউ আবার এককালীন টাকা জোগাড় করে বাস ভাড়া করে ফিরে যাচ্ছেন নিজের জেলা কিংবা গ্রামের বাড়িতে।
পরিচয়পত্র থাকা সত্ত্বেও আটকের শিকার
যশোরের আনিসুর রহমানের গল্প শুনলে বোঝা যায় আতঙ্ক কতটা ভয়াবহ। আট বছর ধরে তিনি গুরুগ্রামে গাড়ি ধোয়ার কাজ করছেন, স্ত্রী গৃহকর্মীর কাজ করেন, ছেলে ছোটখাটো কাজ শিখে উপার্জন শুরু করেছে। অথচ পরিচয়পত্র থাকা সত্ত্বেও তাকে পুলিশ ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে আটক করেছিল। চাঁচোল থানা থেকে পরিচয় যাচাই হয়ে গেলেও কোনো লিখিত প্রমাণপত্র ছাড়া ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
“কাগজ ছাড়া বাইরে বের হতে ভয় পাই। যদি আবার ধরে নিয়ে যায়!”—আনিসুরের এই কথাই বলে দেয় আতঙ্ক কতটা গায়ে লেগে গেছে।
যারা যাচ্ছেন, তারা ফিরেও যেতে ভয় পাচ্ছেন
শুধু আনিসুর রহমান নন, মুকুল হোসেন নামের এক রাজমিস্ত্রিও একইভাবে আটকের শিকার হয়েছিলেন। এক বছর হলো গুরুগ্রামে এসেছিলেন, কিন্তু ‘এখানে এসেই ফেঁসে গেলাম’, বলছেন তিনি। পরিচয়পত্র থাকা সত্ত্বেও আটক, আবার কে জানে কবে আটক করা হবে—এই আতঙ্কে তিনি ট্রেনের টিকিট পেয়েই মালদায় ফিরছেন।
গুরুগ্রামের সেক্টর ১০এ কমিউনিটি সেন্টার এখন পশ্চিমবঙ্গের বহু শ্রমিকের কাছে আতঙ্কের নাম। পরিচয় যাচাই না হওয়া পর্যন্ত দিনের পর দিন আটকে রাখা হচ্ছে, অথচ শেষে মুক্তি মিললেও কোনও লিখিত ছাড়পত্র নেই।
টিকিট না পেয়ে বাস ভাড়া
কেউ আবার টিকিটের জন্য অপেক্ষা না করে নিজেরাই গ্রুপ করে বাস ভাড়া করে ফিরে যাচ্ছেন। একেকজনকে আড়াই হাজার টাকা ভাড়া গুণতে হচ্ছে। দিনমজুর, রাজমিস্ত্রি, গাড়ি ধোয়ার মতো অস্থায়ী কাজে থাকা মানুষদের পক্ষে এই অর্থের ব্যবস্থা করাও সহজ নয়। তবু আতঙ্ক এতটাই গভীর যে টাকা ধার করে হলেও ফিরছেন।
‘দেশে গিয়ে কী খাব?’—অসীম অনিশ্চয়তা
যারা ফিরছেন, তাদের সামনে নতুন সমস্যা—‘দেশে গিয়ে কীভাবে সংসার চলবে?’
যেমন নূর আলম, গুরুগ্রামে ফুড ডেলিভারির কাজ করতেন। স্ত্রীকে নিয়ে থাকতেন সেখানে, বাকি পরিবার গ্রামে। আটকের পরে যখন ছাড়া পেলেন, তখন ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু হলেও নতুন দুশ্চিন্তা—মা-বাবা, সন্তানদের খাবার জুটবে কীভাবে? গ্রামে হয়তো বসতভিটে আছে, কিন্তু চাষের জমি নেই। বিকল্প কাজ কী, তাও অজানা।
হিন্দু-মুসলমান বিভাজন?
গুরুগ্রামের শ্রমিক সংগঠনগুলোর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা হিন্দু শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক তুলনামূলকভাবে কম। তারা এখনও গুরুগ্রামে রয়ে গেছেন। আটক হওয়ার ভয়টা বেশি করে গায়ে লেগেছে মুসলমানদের মধ্যে।
পরিচয় যাচাই, তারপরও ঠেলে দেওয়া বাংলাদেশে
আরও ভয়াবহ দিক হলো—কিছু ঘটনা সামনে এসেছে যেখানে পরিচয় যাচাই সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সুপান্থ সিনহা জানিয়েছেন, কয়েকবার গুরুগ্রামে গিয়ে দেখেছেন—ঘরবাড়ি ফাঁকা, লোকে খোলাখুলি কথা বলতে ভয় পাচ্ছে।
কিছু মানুষ আবার ফিরে যাচ্ছেন পুরোনো কাজে
পরিযায়ী শ্রমিকদের একাংশ—যেমন মেহবুব শেখদের মতো—আবার অনেকে ফিরে যাচ্ছেন ছত্তিসগড়, মহারাষ্ট্র, ওড়িশা-র নির্মাণ প্রকল্পে। কারণ পশ্চিমবঙ্গে ফিরলে কাজ নেই, খাবার নেই। আর ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে আটক হওয়া সত্ত্বেও যে মুক্তি পেয়েছে, সে আবার লুকিয়ে অন্য রাজ্যে ফিরে গিয়ে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে।
মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা: পরিকল্পনা আছে, বাস্তব রূপ কতটা?
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেছেন, অন্য রাজ্য থেকে ফেরত আসা পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য উপার্জনের ব্যবস্থা করা হবে। তবে এই ব্যবস্থা কতটা বাস্তবায়ন হবে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে রয়েছে যথেষ্ট সংশয়।
উপসংহার
বাংলার মাটি থেকে দূরে গিয়ে পেটের দায়ে কাজ খুঁজতে গিয়ে আজ পরিচয় নিয়ে আতঙ্কে ভুগতে হচ্ছে হাজারো শ্রমিককে। কেউ ফিরে যাচ্ছেন পরিবার নিয়ে, কেউ এখনো আটকে আছেন ট্রেনের টিকিটের অপেক্ষায়। ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে আটক হওয়ার আতঙ্ক একরকম নতুন বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে গুরুগ্রামে থাকা বাংলাভাষী মুসলমানদের জন্য।
এই অনিশ্চয়তা আর নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে একটাই প্রশ্ন—‘দেশে ফিরে তো যাব, কিন্তু খাব কী?’


