পশ্চিমবঙ্গে ফের নিপা ভাইরাস নিয়ে উদ্বেগ বাড়ল। উত্তর ২৪ পরগনার বারাসতের দুই নার্স নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সন্দেহে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, তাঁদের দু’জনেরই অবস্থা অত্যন্ত সঙ্কটজনক। বর্তমানে ভেন্টিলেশনে রেখে চিকিৎসা চলছে। বিষয়টি ঘিরে রাজ্যজুড়ে সতর্কতা জারি করেছে প্রশাসন। পরিস্থিতির উপর কড়া নজর রাখছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে।
সোমবার নবান্নে সাংবাদিক বৈঠক করে রাজ্যের মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তী এই তথ্য জানান। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, অযথা আতঙ্কিত হওয়ার কোনও কারণ নেই, তবে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। রাজ্য সরকারের তরফে ইতিমধ্যেই হেল্পলাইন নম্বর চালু করা হয়েছে এবং স্বাস্থ্য দফতর সর্বোচ্চ সতর্কতায় কাজ করছে।
দুই নার্সের অবস্থা কেন এত সঙ্কটজনক
হাসপাতাল সূত্রে খবর, ওই দুই নার্স কয়েক দিন ধরেই জ্বর, শ্বাসকষ্ট ও স্নায়বিক সমস্যায় ভুগছিলেন। প্রাথমিক উপসর্গ দেখে চিকিৎসকদের সন্দেহ হয় নিপা ভাইরাস সংক্রমণের। দ্রুত তাঁদের হাসপাতালে ভর্তি করে আইসোলেশনে রাখা হয়। অবস্থা গুরুতর হওয়ায় ভেন্টিলেশনের সাহায্যে চিকিৎসা চলছে।
যদিও এখনও পর্যন্ত পরীক্ষার চূড়ান্ত রিপোর্ট আসেনি, তবু সাবধানতার খাতিরে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে। নিশ্চিত হওয়ার জন্য তাঁদের নমুনা পুনের একটি বিশেষায়িত পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। রিপোর্ট এলেই স্পষ্ট হবে, সত্যিই তাঁরা নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত কি না।
মুখ্যমন্ত্রীর কড়া নজর, প্রশাসনের তৎপরতা
মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তী জানান, গোটা বিষয়টি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে নজরে রাখছেন। স্বাস্থ্য দফতর, জেলা প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট হাসপাতালকে একসঙ্গে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সোমবার সকালে রাজ্য সরকারের একটি বিশেষ দল ওই হাসপাতালে গিয়ে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে এসেছে।
স্বাস্থ্যসচিব নারায়ণস্বরূপ নিগমও এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে ইতিমধ্যেই একাধিক আলোচনা হয়েছে। রাজ্য সরকার আশ্বস্ত করেছে, প্রয়োজন হলে আরও বিশেষজ্ঞ দল পাঠানো হবে এবং সব ধরনের চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া হবে।
কীভাবে সংক্রমণ হলো, খোঁজ শুরু প্রশাসনের
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, ওই দুই নার্স কীভাবে নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত হলেন। মুখ্যসচিব জানান, এই বিষয়টি খতিয়ে দেখার কাজ শুরু হয়েছে। জানা গিয়েছে, কিছু দিন আগে তাঁরা পূর্ব বর্ধমান গিয়েছিলেন। সেই সফরের সময় কোথায় কোথায় গিয়েছিলেন, কার কার সংস্পর্শে এসেছিলেন, সব তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
এছাড়াও, তাঁরা কর্মসূত্রে যাঁদের সংস্পর্শে এসেছেন, তাঁদের চিহ্নিত করে ‘কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং’ শুরু হয়েছে। উত্তর ২৪ পরগনা, পূর্ব বর্ধমান এবং নদিয়া জেলায় এই কাজ বিশেষভাবে জোরদার করা হয়েছে। প্রশাসনের লক্ষ্য, দ্রুত সম্ভাব্য সংক্রমণের শৃঙ্খল ভেঙে দেওয়া।
কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং ও কড়া নজরদারি
মুখ্যসচিব স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, যাতে ওই দুই নার্সের সংস্পর্শে এসে অন্য কেউ আক্রান্ত না হন, সে জন্য কড়া নজরদারি চালানো হচ্ছে। হাসপাতাল কর্মী, পরিবারের সদস্য এবং সাম্প্রতিক সময়ে যাঁরা তাঁদের কাছাকাছি এসেছিলেন, সবাইকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
প্রয়োজনে তাঁদের নমুনা পরীক্ষাও করা হবে। স্বাস্থ্য দফতর জানিয়েছে, পরিস্থিতি অনুযায়ী আক্রান্ত এলাকার পরিধি বাড়ানো বা কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
রাজ্য সরকারের পরামর্শ: আতঙ্ক নয়, সতর্কতা
নবান্নে সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যসচিব বারবার একটাই বার্তা দিয়েছেন—আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকতে হবে। সাধারণ কিছু স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললেই অনেকটাই ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
তিনি পরামর্শ দেন, খাবার আগে ভালো করে হাত ধুতে হবে। ফল বা সবজি খাওয়ার আগে পরিষ্কার জল দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে। খোলা বা আধখাওয়া খাবার এড়িয়ে চলাই ভালো। যেহেতু নিপা ভাইরাস মূলত বাদুড় থেকে ছড়ায়, তাই বাদুড় যে ফল বা খাবারে বসেছে, সেগুলি না খাওয়াই নিরাপদ।
চালু হলো হেল্পলাইন নম্বর
জনসাধারণের সুবিধার জন্য রাজ্য সরকারের তরফে তিনটি হেল্পলাইন নম্বর চালু করা হয়েছে। নিপা ভাইরাস সংক্রান্ত কোনও উপসর্গ, সন্দেহ বা তথ্য জানাতে এই নম্বরগুলিতে যোগাযোগ করা যাবে।
হেল্পলাইন নম্বরগুলি হল—
(০৩৩) ২৩৩৩ ০১৮০
৯৮৩৬০৪৬২১২
৯৮৭৪৭০৮৮৫৮
স্বাস্থ্য দফতর জানিয়েছে, ২৪ ঘণ্টাই এই নম্বরগুলি সক্রিয় থাকবে।
কেন্দ্রের সঙ্গে রাজ্যের সমন্বয়
এই ঘটনায় কেন্দ্রীয় সরকারও সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছে। সংবাদসংস্থা পিটিআই সূত্রে জানা গিয়েছে, কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নড্ডা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। বিষয়টি নিয়ে তিনি চিঠিও পাঠিয়েছেন এবং কেন্দ্রের তরফে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।
কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যসচিবও রাজ্যের মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তী ও স্বাস্থ্যসচিব নারায়ণস্বরূপ নিগমের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রক পুরো পরিস্থিতির উপর কড়া নজর রাখছে।
নিপা ভাইরাস কী এবং কেন এত ভয়ংকর
নিপা ভাইরাসের মূল উৎস হল বাদুড়। বাদুড়ের আধখাওয়া ফল সুস্থ ফলের সঙ্গে মিশে গেলে সেখান থেকেও এই ভাইরাস ছড়াতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, শুয়োরও নিপা ভাইরাসের বাহক হতে পারে।
এছাড়াও, আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত বিছানা, পোশাক বা দৈনন্দিন জিনিসপত্র থেকেও সংক্রমণ ছড়ানোর ক্ষমতা রাখে এই ভাইরাস। সাধারণ ভাইরাল জ্বরের মতো উপসর্গ দিয়ে শুরু হলেও নিপা ভাইরাস অত্যন্ত প্রাণঘাতী। মৃত্যুহার প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
নিপা ভাইরাসের লক্ষণ কী কী
নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে প্রথমে সাধারণ জ্বর দেখা দেয়। ধীরে ধীরে শরীরের তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। মাথাব্যথা, বমি ও দুর্বলতা শুরু হয়। পরে সংক্রমণ মস্তিষ্কে পৌঁছলে খিঁচুনি দেখা দিতে পারে।
অনেকের ক্ষেত্রে গলা ব্যথা ও তীব্র শ্বাসকষ্ট দেখা যায়। রোগ গুরুতর হলে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই রোগী কোমায় চলে যেতে পারেন। মস্তিষ্কে প্রদাহ ও হৃদ্পেশিতে প্রদাহও হতে পারে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
চিকিৎসা ও টিকা নিয়ে বর্তমান অবস্থা
নিপা ভাইরাসের জন্য এখনও নির্দিষ্ট কোনও চিকিৎসা পদ্ধতি বা টিকা নেই। রোগীর উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হয়। মূলত রোগীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার উপরই সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা নির্ভর করে। তাই দ্রুত রোগ শনাক্ত করা এবং সময়মতো চিকিৎসা শুরু করা অত্যন্ত জরুরি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, নিপা ভাইরাসের টিকা নিয়ে গবেষণা চলছে। তবে আপাতত কোনও অনুমোদিত টিকা নেই।


