কলকাতার বড়দিন মানেই পার্ক স্ট্রিট। আলো, গান, মানুষের ভিড় আর উৎসবের আনন্দে এই এলাকা কয়েক দিনের জন্য বদলে যায় একেবারে। কিন্তু এত মানুষের জমায়েতে যেন বিশৃঙ্খলা না হয়, সেই দায়িত্বটা থাকে পুলিশের ওপর। তাই বড়দিনের আগেই পার্ক স্ট্রিট ও আশপাশের এলাকায় বিশেষ ট্রাফিক ও নিরাপত্তা পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে কলকাতা পুলিশ। চলুন সহজ করে পুরো বিষয়টা বুঝে নেওয়া যাক।
বড়দিন উপলক্ষে কেন এত কড়া ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ
প্রতি বছর বড়দিনের রাতে পার্ক স্ট্রিটে লক্ষাধিক মানুষ ভিড় করেন। কেউ আসেন বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে, কেউ বা পরিবার নিয়ে আলো দেখতে। এত গাড়ি আর মানুষের চাপে স্বাভাবিক ট্রাফিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। সেই কারণেই আগেভাগে রাস্তায় নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। মূল লক্ষ্য একটাই—যান চলাচল মসৃণ রাখা এবং মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
কোন সময় থেকে কার্যকর হবে ট্রাফিক নিয়ম
কলকাতা পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে, ২৪ ডিসেম্বর বিকেল ৪টা থেকে ২৫ ডিসেম্বর ভোর ৪টা পর্যন্ত পার্ক স্ট্রিট এবং সংলগ্ন এলাকায় বিশেষ ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ কার্যকর থাকবে। এই সময়ে পণ্যবাহী গাড়ির চলাচলও সীমিত করা হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী এই নিয়ন্ত্রণ আবার ২৫ ডিসেম্বর বিকেল থেকেও চালু হতে পারে। কতক্ষণ চলবে, তা পরিস্থিতি দেখে ট্রাফিক ডিসি ঠিক করবেন।
কোন কোন রাস্তায় চলাচল সীমিত থাকবে
ভিড়ের চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ে যেসব রাস্তায়, সেগুলোকেই বেশি নজরে রাখা হচ্ছে। এজেসি বোস রোড ধরে উত্তরমুখী যান, স্ট্র্যান্ড রোড দিয়ে পূর্বমুখী যান এবং ধর্মতলা পেরিয়ে দক্ষিণমুখী যান চলাচল নিয়ন্ত্রিত হবে। প্রয়োজনে এসব গাড়িকে বিকল্প রাস্তায় ঘুরিয়ে দেওয়া হতে পারে।
সহজ করে বললে, আপনি যদি গাড়ি নিয়ে বেরোনোর পরিকল্পনা করেন, তাহলে একটু বাড়তি সময় হাতে রাখাই ভালো।
ওয়ান ওয়ে ব্যবস্থা: কোথায় কোন দিকে চলবে গাড়ি
ভিড় সামলাতে একমুখী যান চলাচল খুব কার্যকর। তাই বেশ কয়েকটি রাস্তায় ওয়ান ওয়ে চালু করা হচ্ছে।
শেক্সপিয়র সরণিতে পূর্ব থেকে পশ্চিমে গাড়ি চলবে।
হো চি মিন সরণিতে চলবে পশ্চিম থেকে পূর্বে।
মিডলটন স্ট্রিটে ক্যামাক স্ট্রিট থেকে জওহরলাল নেহরু রোডের দিকে একমুখী যান চলবে।
লিটল রাসেল স্ট্রিটে দক্ষিণ থেকে উত্তর দিকে গাড়ি চলবে।
ক্যামাক স্ট্রিটেও নির্দিষ্ট অংশে উত্তর থেকে দক্ষিণে ওয়ান ওয়ে কার্যকর থাকবে।
এই ব্যবস্থা মানলে যানজট কম হবে, আর পুলিশের কাজও সহজ হবে।
কোথায় যাওয়া যাবে না গাড়ি নিয়ে
নির্দিষ্ট কিছু জায়গা থেকে পার্ক স্ট্রিটের দিকে গাড়ি ঢুকতে দেওয়া হবে না। রয়েড স্ট্রিট ও ফ্রি স্কুল স্ট্রিট ক্রসিং থেকে পার্ক স্ট্রিটে প্রবেশ বন্ধ থাকবে। একইভাবে পার্ক স্ট্রিট ও রাসেল স্ট্রিট ক্রসিং থেকে রাসেল স্ট্রিটে ডানদিকে মোড় নেওয়াও নিষিদ্ধ।
এই নিয়মগুলো একটু ঝামেলার মনে হলেও, ভিড়ের সময় এগুলোই বড় দুর্ঘটনা এড়াতে সাহায্য করে।
পরিস্থিতি অনুযায়ী হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা পুলিশের
ভিড় যদি খুব বেড়ে যায়, তাহলে যে কোনও সময় ক্যাথিড্রাল রোডে যান চলাচল বন্ধ করে দিতে পারে পুলিশ। আবার ২৫ ডিসেম্বর কিছু রাস্তায় কেবল নির্দিষ্ট দিকের গাড়িকেই চলার অনুমতি দেওয়া হতে পারে। শেক্সপিয়র সরণি, ক্যামাক স্ট্রিট, কিড স্ট্রিট ও ফ্রি স্কুল স্ট্রিটেও বিশেষ পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রণ জারি হতে পারে।
মানে এক কথায়, পুলিশ পরিস্থিতি দেখে সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেবে।
‘নো পার্কিং’ জোন: কোথায় গাড়ি রাখা যাবে না
গাড়ি এলোমেলোভাবে পার্ক করা হলে রাস্তা আরও সরু হয়ে যায়। তাই বেশ কয়েকটি রাস্তা পুরোপুরি নো পার্কিং জোন ঘোষণা করা হয়েছে।
এই তালিকায় রয়েছে পার্ক স্ট্রিট, ক্যামাক স্ট্রিট, মিডলটন স্ট্রিট, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, লিটল রাসেল স্ট্রিট, কিড স্ট্রিট, রাসেল স্ট্রিট, রয়েড স্ট্রিট, রফি আহমেদ কিদওয়াই রোড এবং উড স্ট্রিট।
এই এলাকায় গাড়ি রাখলে জরিমানা বা গাড়ি তুলে নেওয়ার ঝুঁকি আছে।
জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থানের আশেপাশেও সতর্কতা
বড়দিনে শুধু পার্ক স্ট্রিট নয়, শহরের অনেক জায়গায় ভিড় বাড়ে। তাই ভারতীয় জাদুঘর, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, আলিপুর চিড়িয়াখানা, কালীঘাট মন্দির, নিউ মার্কেট, মিলেনিয়াম পার্কের মতো এলাকায় গাড়ি পার্কিংয়ের অনুমতি নাও দেওয়া হতে পারে।
আপনি যদি এসব জায়গায় যাওয়ার পরিকল্পনা করেন, তাহলে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
নিরাপত্তায় বাড়তি জোর: মোতায়েন ১৫০০ পুলিশ
এ বছর বড়দিনে নিরাপত্তা নিয়ে কোনও ঝুঁকি নিতে চাইছে না কলকাতা পুলিশ। তাই অতিরিক্ত ১৫০০ পুলিশ মোতায়েন করা হচ্ছে। ডেপুটি কমিশনার থেকে শুরু করে ইন্সপেক্টর স্তরের অফিসাররা মাঠে থাকবেন।
সাদা পোশাকের পুলিশ, মহিলা পুলিশ, স্পেশাল ব্রাঞ্চ—সবাই থাকবে নজরদারিতে। পার্ক স্ট্রিট জুড়ে বসানো হয়েছে ওয়াচ টাওয়ার। ড্রোনে নজরদারি চলবে, থাকবে কুইক রেসপন্স টিম ও অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবা।
পথচারীদের জন্যও আলাদা পরিকল্পনা
শুধু গাড়ি নয়, হাঁটা মানুষের ভিড়ও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। তাই যারা হেঁটে পার্ক স্ট্রিট ঘুরবেন, তাঁদের জন্যও একমুখী চলাচলের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
এক দিক দিয়ে পার্ক স্ট্রিটে ঢুকে সোজা অ্যালেন পার্ক পর্যন্ত যেতে হবে। সেখান থেকে অন্য দিক দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারবেন। এতে এক জায়গায় ভিড় জমবে না, আর হাঁটাও হবে স্বচ্ছন্দে।
অতীতের অভিজ্ঞতা থেকেই বাড়তি সতর্কতা
সদ্য যুবভারতী স্টেডিয়ামে বড় একটি অনুষ্ঠানে যে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছিল, তা প্রশাসনের মাথায় রয়েছে। পুলিশ মনে করছে, রাস্তা ও ফুটপাথ ওয়ান ওয়ে রাখলে সেই ধরনের সমস্যা এড়ানো সম্ভব হবে।
তাদের বিশ্বাস, পরিকল্পনা মেনে চললে এবারের বড়দিন শান্তিপূর্ণ আর আনন্দময় হবে।
সাধারণ মানুষের জন্য ছোট্ট পরামর্শ
বড়দিনে যদি পার্ক স্ট্রিট যাওয়ার ইচ্ছে থাকে, তাহলে একটু আগেভাগে বেরোন। গাড়ি নিয়ে না গিয়ে মেট্রো বা বাস ব্যবহার করলে ঝামেলা কম হবে। পুলিশের নির্দেশ মানলে আপনার নিজেরই সুবিধা হবে।
সব মিলিয়ে, উৎসবের আনন্দ যাতে কোনও অস্বস্তিতে না বদলে যায়, সেই চেষ্টাই করছে কলকাতা পুলিশ। নিয়ম মেনে চললে বড়দিনের রাতটা সবার জন্যই হয়ে উঠবে নিরাপদ আর স্মরণীয়।


