ভারতের বন ও বন্যপ্রাণ সংরক্ষণে আসতে চলেছে এক অভিনব অধ্যায়। গণ্ডারের বদলে বাঘ, শঙ্খচূড় সাপের বিনিময়ে কুমির—শুনতে যেন গল্পের মতো লাগলেও, এটাই এখন বাস্তব। আগামী তিন বছরে অসম ও মধ্যপ্রদেশের দুই গুরুত্বপূর্ণ জঙ্গলে শুরু হতে চলেছে প্রাণীদের বড় ধরনের স্থানান্তর। লক্ষ্য একটাই—জীববৈচিত্র্য বাড়ানো এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য আরও শক্ত করা।
এই সিদ্ধান্ত শুধু দুই রাজ্যের মধ্যে প্রাণী বিনিময় নয়, বরং ভারতের বন ব্যবস্থাপনায় এক নতুন দৃষ্টান্ত হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
অসমের জঙ্গল আর তার অনন্য প্রাণীজগৎ
অসম বললেই প্রথমে যে প্রাণীটির কথা মনে পড়ে, তা হলো একশৃঙ্গ গণ্ডার। সারা পৃথিবীতে এই গণ্ডারের সবচেয়ে বড় আবাসস্থল অসমই। কাজিরাঙ্গা, মানস, পোবিতোরা—এই সব জঙ্গলে গণ্ডারদের অবাধ বিচরণ চোখে পড়ার মতো।
শুধু গণ্ডার নয়, অসমের জঙ্গলে রয়েছে বন মহিষ, যারা জল আর স্থল—দু’জায়গাতেই সমান সাবলীল। এদের বিশাল দেহ আর শক্তিশালী উপস্থিতি জঙ্গলের বাস্তুতন্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পাশাপাশি রয়েছে বিষাক্ত ও বিরল শঙ্খচূড় সাপ, যাকে আমরা কিং কোবরা নামেই বেশি চিনি। এই সাপের উপস্থিতিও অসমের জীববৈচিত্র্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
এই প্রাণীগুলো অসমের জঙ্গলে নিরাপদে থাকলেও ভারতের অন্য অনেক জঙ্গলে এদের দেখা প্রায় নেই বললেই চলে।
মধ্যপ্রদেশের জঙ্গল: বাঘের রাজ্য, কিন্তু ঘাটতি আছে
অন্যদিকে মধ্যপ্রদেশ মানেই বাঘ। কানহা, বান্ধবগড়, পেঞ্চ—এই নামগুলো শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের ছবি। পাশাপাশি মধ্যপ্রদেশের নদী ও জলাভূমিতে রয়েছে কুমিরের ভালো উপস্থিতি।
কিন্তু এখানেই শেষ নয়। মধ্যপ্রদেশের জঙ্গলে একশৃঙ্গ গণ্ডার নেই, বন মহিষ নেই, এমনকি শঙ্খচূড় সাপও প্রায় অনুপস্থিত। বিশেষ করে বন মহিষ তো সেখানে ১০০ বছরেরও বেশি সময় আগে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ফলে জীববৈচিত্র্যের দিক থেকে কিছুটা ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এই ঘাটতি পূরণ করতেই নেওয়া হয়েছে এই বড় সিদ্ধান্ত।
দুই মুখ্যমন্ত্রীর বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
জীববৈচিত্র্য বাড়ানো ও বন সংরক্ষণের বিষয়টি মাথায় রেখে অসম ও মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীরা একাধিক বৈঠক করেন। সেখানেই ঠিক হয়, দুই রাজ্য নিজেদের মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু বন্যপ্রাণী বিনিময় করবে।
চুক্তি অনুযায়ী, মধ্যপ্রদেশ অসমকে দেবে ২টি বাঘ এবং ৬টি মুগার কুমির। বিনিময়ে অসম দেবে ২টি একশৃঙ্গ গণ্ডার, ৫০টি বন মহিষ এবং ৩টি শঙ্খচূড় সাপ। এই পুরো প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে আগামী তিন বছরের মধ্যে সম্পন্ন করা হবে।
শুনতে অদ্ভুত লাগলেও, বন বিশেষজ্ঞদের মতে এটি একটি সুপরিকল্পিত এবং বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত।
কোন প্রাণী কোথায় যাবে
এই বিনিময়ের প্রতিটি ধাপ খুব সতর্কতার সঙ্গে নির্ধারণ করা হয়েছে। অসম থেকে যে একশৃঙ্গ গণ্ডার ও শঙ্খচূড় সাপ যাবে, তাদের রাখা হবে মধ্যপ্রদেশের ভোপালের বন বিহার জাতীয় উদ্যানে। এটি একটি সুরক্ষিত এলাকা, যেখানে প্রাকৃতিক পরিবেশ বজায় রেখে প্রাণীদের দেখভাল করা সম্ভব।
ভালো খবর হলো, এখানে সাধারণ মানুষও নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে এই প্রাণীগুলো দেখার সুযোগ পাবেন। এতে একদিকে যেমন পর্যটনের সুযোগ বাড়বে, অন্যদিকে মানুষের মধ্যে বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি হবে।
অন্যদিকে ৫০টি বন মহিষকে রাখা হবে কানহা টাইগার রিজার্ভে। দীর্ঘদিন পর এই জঙ্গলে আবার বন মহিষ ফিরবে, যা স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
কেন এই প্রাণী বিনিময় এত গুরুত্বপূর্ণ
অনেকে ভাবতে পারেন, এক জঙ্গল থেকে আরেক জঙ্গলে প্রাণী পাঠানোই বা এত বড় বিষয় কেন। কিন্তু বাস্তবে এটি খুবই সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ।
প্রতিটি প্রাণী জঙ্গলের খাদ্যচক্র, উদ্ভিদবিন্যাস এবং পরিবেশের ভারসাম্যের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। যেমন, বন মহিষ ঘাসভূমি নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, গণ্ডার জলাভূমির পরিবেশ ঠিক রাখতে ভূমিকা রাখে, আবার বাঘ ও কুমির শিকারি হিসেবে অন্য প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখে।
এই সব প্রাণী একসঙ্গে থাকলেই একটি জঙ্গল সত্যিকার অর্থে স্বাস্থ্যবান হয়ে ওঠে।
স্থানান্তরের আগে থাকছে কড়া নজরদারি
এই প্রাণী বিনিময় হঠাৎ করে হবে না। প্রতিটি প্রাণীর শারীরিক অবস্থা, বয়স, স্বভাব—সব কিছু পরীক্ষা করে তবেই স্থানান্তর করা হবে। বিশেষজ্ঞ পশু চিকিৎসক ও বনকর্মীদের একটি দল পুরো প্রক্রিয়াটি পর্যবেক্ষণ করবে।
প্রথমে প্রাণীগুলোকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পর্যবেক্ষণে রাখা হবে, তারপর ধীরে ধীরে নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে। যেন কোনো প্রাণীর ওপর অযথা চাপ না পড়ে, সেদিকেও বিশেষ নজর রাখা হবে।
সাধারণ মানুষের আগ্রহ ও কৌতূহল
এই খবর সামনে আসার পর সাধারণ মানুষের মধ্যেও ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়েছে। অনেকেই প্রথমবার শুনছেন, রাজ্যের মধ্যে এমন প্রাণী বিনিময়ের পরিকল্পনা হয়। বিশেষ করে ভোপালের বন বিহারে গণ্ডার ও শঙ্খচূড় দেখার সুযোগ পাওয়া যাবে—এই খবর পর্যটনপ্রেমীদের মধ্যে আলাদা উত্তেজনা তৈরি করেছে।
একইভাবে অসমে বাঘ ও কুমিরের সংখ্যা বাড়লে জঙ্গলের আকর্ষণ আরও বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রকৃতির ভারসাম্যের দিকে এক সাহসী পদক্ষেপ
গণ্ডারের বিনিময়ে বাঘ, শঙ্খচূড়ের বদলে কুমির—এই পরিকল্পনা শুধু শিরোনামে চমক তৈরি করার জন্য নয়। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ গবেষণা, পরিকল্পনা আর প্রকৃতির প্রতি দায়িত্ববোধ।
আগামী তিন বছরে এই ‘বাসা বদল’ সফল হলে ভারতের বন সংরক্ষণে এটি একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। হয়তো ভবিষ্যতে আরও রাজ্য এই মডেল অনুসরণ করবে। কারণ শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য একটাই—প্রকৃতিকে তার নিজের ছন্দে, তার নিজের নিয়মে বাঁচতে দেওয়া।


