নারী নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ: হাসপাতাল ও কলেজ চত্বরে নিরাপত্তাহীনতা
“মেয়েদের হাসপাতালে নিরাপত্তা নেই, কলেজেও নিরাপত্তা নেই”—এই কথাটি আজ আর শুধু অভিযোগ নয়, এক করুণ বাস্তবতা। কসবা আইন কলেজের ছাত্রী মধুবন চক্রবর্তীর মতে, দীর্ঘদিন ধরে এই কলেজে ছাত্রীদের যৌন হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। অভিযুক্তরা রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকায় এতদিন ধরা পড়েনি।
ঠিক এক বছর আগে আরজি কর মেডিকেল কলেজে এক তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় উত্তাল হয়েছিল শহর। বহু মানুষ প্রতিবাদে রাস্তায় নামেন, তার মধ্যেই ছিলেন মধুবন।
শহরের নিরাপত্তা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী মধুরিমা দত্ত জানিয়েছেন, অফিস থেকে ফেরার পথে নিরাপত্তা নিয়ে পরিবার সবসময় উদ্বিগ্ন থাকে। গাড়ি করে ড্রপ দিলেও পুরো নিশ্চিন্ত হওয়া যায় না। অন্যদিকে কলেজছাত্রী তৃণা দাশ বলেন, “দিল্লির তুলনায় কলকাতা অনেক নিরাপদ। এখানে অন্তত মেয়েরা কিছুটা নিশ্চিন্তে চলাফেরা করতে পারে।”
পরিসংখ্যান অনুযায়ী ‘নিরাপদতম শহর’ কলকাতা?
ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরো (NCRB)–এর ২০২২ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০ লাখের বেশি জনসংখ্যার শহরগুলোর মধ্যে কলকাতায় অপরাধের সংখ্যা সবচেয়ে কম (প্রতি লাখে ৮৬.৫টি মামলা)। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রায়শই এ তথ্য উল্লেখ করে থাকেন।
তবে পুলিশের প্রাক্তন আধিকারিক অনিল কুমার জানা মনে করেন, “এই পরিসংখ্যান বাস্তব চিত্রকে প্রতিফলিত করে না। অনেক অপরাধ পুলিশে রিপোর্টই হয় না।”
নারী সুরক্ষায় প্রশাসনিক উদ্যোগ ও বাস্তবতা
আরজি করের ঘটনার পর মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে নারী কর্মীদের নিরাপত্তার জন্য একটি নীতিমালার খসড়া তৈরি হয়, যেখানে বলা হয়েছে:
- রাতে কর্মরত নারীদের জন্য নিরাপত্তারক্ষী মোতায়েন
- সিসিটিভি নজরদারি
- পর্যাপ্ত আলো ও শৌচাগার
- কর্মস্থলে নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা
এই নীতিমালাটি এখনও অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
পাশাপাশি ‘রাত্রীসাথী’ নামের একটি প্রকল্প চালু করা হয়েছে, যাতে নারী কর্মীরা রাতে নিরাপদে চলাচল করতে পারেন।
বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, পরিস্থিতি অপরিবর্তিত
একাধিক সরকারি হাসপাতালের নার্স ও ইন্টার্ন চিকিৎসক জানিয়েছেন, এখনো ক্যাম্পাসে পর্যাপ্ত আলো নেই, বাথরুমের অবস্থা নাজুক এবং রাতের ডিউটিতে নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তা থেকেই যায়।
আইটি কর্মী দীপান্বিতা দাশ বলেন, “এক বছর ধরে সরকার শুধু মৌখিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, বাস্তবায়ন কিছুই হয়নি।”
রাজনৈতিক আশ্রয়ে অপরাধ: বিচারপ্রাপ্তির প্রতিবন্ধকতা
ওড়িশা, কসবা, আরজি কর—প্রতিটি ঘটনায় দেখা গেছে, অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে গিয়ে ভুক্তভোগীরা বহুবার মুখ থুবড়ে পড়েছেন। অনেকেই প্রকাশ্যে আসেননি, কারণ বিচারপ্রাপ্তির বিশ্বাস ছিল না।
সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা অনিল কুমার জানার মতে, “যে কোনো অপরাধের পর প্রশাসনের দায়িত্ব হওয়া উচিত তা যথাযথভাবে বিচার করা। কিন্তু এখানে সেটাই হচ্ছে না।”
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মত: কী বদলানো দরকার?
শিক্ষক ও ফেমিনিস্ট অ্যাক্টিভিস্ট শতাব্দী দাশ বলেন, “আরজি কর ঘটনার পর আমাদের কয়েকটি নির্দিষ্ট দাবি ছিল—সড়কে আলো, শৌচাগার, ২৪ ঘণ্টা গণপরিবহন, কলেজে ইন্টারনাল কমপ্লেন কমিটি, প্রোহিবিশন অফ সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট অ্যাক্টের কার্যকর প্রয়োগ। কিন্তু তার বাস্তবায়ন হয়নি।”
তিনি আরও বলেন, “সরকার অপরাজিতা বিল বা কঠোর শাস্তির কথা বললেও, বাস্তবে নিরাপত্তা আসেনি। আমরা এখনো রাতের সময় বাইরে গেলে পরিবারের লোকেদের লোকেশন জানিয়ে রাখি।”
অধ্যাপিকা শাশ্বতী ঘোষ বলেন, “রাজনৈতিক দলগুলোর একাংশ এই ইস্যুতে দায়িত্ব নিতে চায় না। নারীর নিরাপত্তা বরাবরই রাজনৈতিক চাপানউতোরের শিকার।”
সচেতনতা বাড়ছে, প্রতিবাদে ভয় কমছে
তবে একবছরের ধারাবাহিক আন্দোলনের ফলে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে। মেয়েরা এখন আগের চেয়ে বেশি সরব, প্রতিবাদ করছে, অভিযোগ জানাচ্ছে। শাশ্বতী ঘোষ বলেন, “আজকের মেয়েরা চুপ করে নেই, তারা রাস্তায়, কলেজে, অফিসে, এমনকি পরিবারেও নিজের অধিকারের কথা বলছে।”
নারী নিরাপত্তা: শুধু প্রশাসনিক উদ্যোগে নয়, চাই সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির বদল
কলকাতা যদি সত্যি নারীর জন্য নিরাপদ শহর হয়ে উঠতে চায়, তবে শুধু পরিসংখ্যানের ওপর ভরসা না রেখে বাস্তব সমস্যাগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রশাসনিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে কঠোরভাবে। একইসঙ্গে সমাজের মানসিকতার পরিবর্তন, নারীকে সম্মান এবং বিচারপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে।


