বর্ষবরণের আনন্দমুখর রাত মুহূর্তের মধ্যে রূপ নিল ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে। সুইৎজ়ারল্যান্ডের জনপ্রিয় পর্যটন শহর ক্র্যানস-মন্টানায় নববর্ষ উদ্যাপনের সময় ঘটে গেল এক মর্মান্তিক বিস্ফোরণ। স্থানীয় সময় অনুযায়ী গভীর রাতে একটি ব্যস্ত পানশালায় পরপর বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে গোটা এলাকা। আগুন ছড়িয়ে পড়ে মুহূর্তের মধ্যেই। বহু মানুষ আহত হয়েছেন। অনেকের মৃত্যুর আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এই ঘটনায় শুধু একটি পানশালাই নয়, কেঁপে উঠেছে গোটা সুইৎজ়ারল্যান্ড। বর্ষবরণের রাতে এমন ভয়াবহ ঘটনা দেশটির ইতিহাসে বিরল বলেই মনে করছেন অনেকে।
বর্ষবরণের আনন্দের মাঝেই ভয়াবহ বিস্ফোরণ
সুইস সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সময় অনুযায়ী রাত প্রায় দেড়টা নাগাদ ক্র্যানস-মন্টানার ‘লে কনস্টেলেশন’ নামে একটি জনপ্রিয় পানশালায় প্রথম বিস্ফোরণটি ঘটে। তখন পানশালার ভেতরে শতাধিক মানুষ নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে ব্যস্ত ছিলেন। হাসি, গান আর উদ্যাপনের মাঝেই আচমকা বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে চারদিক।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, প্রথম বিস্ফোরণের পর একের পর এক বিস্ফোরণ ঘটে। মুহূর্তের মধ্যেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো পানশালায়। ধোঁয়ায় ঢেকে যায় ভেতরের অংশ। আলো নিভে গিয়ে শুরু হয় তীব্র আতঙ্ক।
আতঙ্কে ছোটাছুটি, আহত বহু মানুষ
বিস্ফোরণের পর পানশালার ভেতরে থাকা মানুষজন প্রাণ বাঁচাতে ছোটাছুটি শুরু করেন। কেউ দরজার দিকে ছুটেছেন, কেউ জানালা ভাঙার চেষ্টা করেছেন। ধোঁয়া আর আগুনের মধ্যে অনেকেই দিশেহারা হয়ে পড়েন।
স্থানীয় প্রশাসনের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ঘটনায় বহু মানুষ গুরুতর আহত হয়েছেন। দগ্ধ ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্তদের দ্রুত হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। যদিও এখনও পর্যন্ত হতাহতের নির্দিষ্ট সংখ্যা জানানো হয়নি, তবে পুলিশের ধারণা, এই ঘটনায় একাধিক মানুষের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে।
জরুরি পরিষেবার যুদ্ধকালীন তৎপরতা
খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভ্যালাইস ক্যান্টন পুলিশ, দমকল বাহিনী ও জরুরি স্বাস্থ্য পরিষেবা ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। আনা হয় একাধিক অ্যাম্বুলেন্স ও উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার। রাতের অন্ধকার আর আগুনের মধ্যেও যুদ্ধকালীন তৎপরতায় চলে উদ্ধারকাজ।
আহতদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। দমকল বাহিনী দীর্ঘ সময় ধরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার কাজ চালায়। পুরো এলাকা ঘিরে ফেলা হয় নিরাপত্তার কারণে।
পুলিশ ও প্রশাসনের প্রাথমিক বক্তব্য
সংবাদসংস্থা এএফপি সূত্রে জানা গেছে, ভ্যালাইস ক্যান্টন পুলিশের মুখপাত্র গেটান ল্যাথিয়ন জানিয়েছেন, ঘটনায় বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন এবং অনেকের মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিক ভাবে মনে করা হচ্ছে। তবে এখনও পর্যন্ত সরকারি ভাবে মৃতের সংখ্যা নিশ্চিত করা হয়নি।
তিনি আরও জানান, বিস্ফোরণের সঠিক কারণ এখনও স্পষ্ট নয়। কীভাবে এবং কেন এই বিস্ফোরণ ঘটল, তা জানতে তদন্ত শুরু হয়েছে। ফরেনসিক দল ঘটনাস্থল খতিয়ে দেখছে।
কোথা থেকে শুরু হয়েছিল বিস্ফোরণ
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পানশালার বেসমেন্ট অংশে প্রথম বিস্ফোরণটি ঘটে। সেখান থেকেই আগুন দ্রুত উপরের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। বেসমেন্টে কী ধরনের সামগ্রী মজুত ছিল, বা গ্যাস লিকের মতো কোনও সমস্যা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
‘লে কনস্টেলেশন’ পানশালাটি সাধারণত রাত ২টো পর্যন্ত খোলা থাকে। সর্বোচ্চ প্রায় ৪০০ জন অতিথিকে আপ্যায়নের ব্যবস্থা রয়েছে এখানে। বর্ষবরণের রাতে স্বাভাবিকভাবেই অতিরিক্ত ভিড় ছিল। সেই কারণেই হতাহতের সংখ্যা বেশি হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নাশকতার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না
এই বিস্ফোরণ দুর্ঘটনা না নাশকতা, তা এখনও নিশ্চিত নয়। পুলিশ সমস্ত সম্ভাবনা মাথায় রেখে তদন্ত করছে। কোনও ধরনের ইচ্ছাকৃত হামলা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান এবং প্রযুক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
সুইৎজ়ারল্যান্ড সাধারণত নিরাপদ দেশ হিসেবেই পরিচিত। তাই বর্ষবরণের রাতে এমন ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ বাড়িয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।
পর্যটন শহর ক্র্যানস-মন্টানায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া
ক্র্যানস-মন্টানা সুইৎজ়ারল্যান্ডের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন শহর। বর্ষবরণের সময় এখানে দেশ-বিদেশের হাজার হাজার পর্যটক ভিড় করেন। এই ঘটনায় গোটা শহরে শোকের আবহ নেমে এসেছে।
যেখানে নতুন বছরের শুরু হওয়ার কথা ছিল আনন্দ আর উৎসবে, সেখানে এখন শোনা যাচ্ছে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন আর আতঙ্কিত মানুষের কান্না। অনেক পরিবার এখনও তাদের প্রিয়জনের খোঁজ পাচ্ছেন না।
সরকারের নজরদারি ও পরবর্তী পদক্ষেপ
ঘটনার গুরুত্ব বুঝে সুইস সরকার বিষয়টির উপর কড়া নজর রাখছে। প্রয়োজন হলে জাতীয় স্তরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার কথাও ভাবা হচ্ছে। অন্যান্য পর্যটন এলাকাতেও সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত পানশালাটি বন্ধ থাকবে। ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে নিরাপত্তা বিধি আরও কঠোর করা হতে পারে।
শেষ কথা
বর্ষবরণের রাতে সুইৎজ়ারল্যান্ডের এই ভয়াবহ বিস্ফোরণ শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, এটি বহু মানুষের জীবনে গভীর ক্ষত রেখে গেল। আনন্দের মুহূর্ত যে কত দ্রুত ভয়াবহ ট্র্যাজেডিতে বদলে যেতে পারে, এই ঘটনা তারই নির্মম উদাহরণ।
এখন সবার একটাই আশা—আহতরা দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠুন এবং তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য সামনে আসুক। নতুন বছরের শুরুটা যেখানে আনন্দে ভরপুর হওয়ার কথা ছিল, সেখানে এই শোকের ছায়া দীর্ঘদিন মনে থেকে যাবে।


