ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় চলমান ইসরায়েলি হামলায় বিশ্বখ্যাত সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার পাঁচজন সাহসী সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন আনাস আল-শরীফ—যিনি গাজার ভয়াবহ বাস্তবতা বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে ছিলেন নির্ভীক ও অক্লান্ত।
মৃত্যুর আগে আনাস এক্স (টুইটার)-এ একটি গভীর আবেগঘন শেষ বার্তা দিয়ে গেছেন, যা তাঁর শাহাদাতের পর প্রকাশিত হয়। সেখানে তিনি গাজাকে ভুলে না যাওয়ার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান। তাঁর পরিবার জানায়, মৃত্যুর পর এই বার্তাটি প্রকাশের অনুরোধ করেছিলেন তিনি।
আনাসের জন্ম ও বেড়ে ওঠা জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে। সেখানকার অলি-গলিতে বড় হয়ে তিনি ছোটবেলা থেকেই নিজের জনগণের সমর্থনে কণ্ঠস্বর হিসেবে দাঁড়িয়েছিলেন। স্বপ্ন ছিল, একদিন দখলকৃত আসকালান (আল-মাজদাল) শহরে ফিরে যাবেন পরিবারের সঙ্গে। কিন্তু ভাগ্যের লিখন ছিল ভিন্ন—তিনি শহীদ হলেন মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য।
তিনি জীবনের প্রতিটি ধাপে অসংখ্য কষ্ট সহ্য করেছেন। ক্ষতি ও বেদনার মধ্যেও কখনো সত্যকে বিকৃত করেননি বা মিথ্যা বলেননি। তাঁর সাংবাদিকতা ছিল নিপীড়িত মানুষের সত্য কণ্ঠস্বর।
শেষ বার্তায় আনাস স্পষ্ট করে বলেন—যারা গাজার শিশু ও নারীদের হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে নীরব থেকেছে, যারা কিছুই করেনি, আল্লাহ তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী থাকবেন। তিনি জানান, গাজার মানুষ দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে ভয়াবহ নির্যাতন সহ্য করছে।
আনাস তাঁর বার্তায় ফিলিস্তিনকে “মুসলিম বিশ্বের মুকুটের রত্ন” ও “প্রত্যেক স্বাধীন মানুষের হৃদস্পন্দন” বলে উল্লেখ করেন। তিনি বিশ্ববাসীর হাতে তুলে দেন গাজার নিপীড়িত জনগণ ও সেই শিশুদের, যারা কখনো স্বপ্ন দেখার বা শান্তিতে বেঁচে থাকার সুযোগও পায়নি।
তিনি আহ্বান জানান—সীমান্ত বা শিকল যেন মানুষের কণ্ঠকে স্তব্ধ না করে। যতক্ষণ না ফিলিস্তিনের আকাশে স্বাধীনতার সূর্য ওঠে, ততক্ষণ সবাই যেন মুক্তির সেতু হয়ে দাঁড়ায়।
আনাস তাঁর প্রিয় কন্যা শাম-কে, পুত্র সালাহ-কে, মা ও স্ত্রী উম্মে সালাহ (বায়ান)-কে বিশ্ববাসীর হাতে সঁপে দেন। তিনি উল্লেখ করেন—কন্যার বড় হয়ে ওঠা তাঁর স্বপ্ন ছিল, কিন্তু পূরণ হলো না।পুত্রকে শক্ত করে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, যাতে সে বাবার লক্ষ্যে অবিচল থাকতে পারে।মা ছিলেন তাঁর জীবনের দুর্গ, যিনি দোয়া দিয়ে তাঁকে এগিয়ে নিয়েছেন।স্ত্রী ছিলেন ধৈর্য ও বিশ্বাসের প্রতীক, যিনি যুদ্ধের সময় বিচ্ছিন্ন থাকলেও অটল থেকেছেন।
আনাস আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন—তাঁকে শহীদদের অন্তর্ভুক্ত করতে, অতীত ও ভবিষ্যতের গুনাহ ক্ষমা করতে এবং তাঁর রক্তকে স্বাধীনতার আলো বানাতে। তিনি জানান, জীবনে কখনো নিজের অঙ্গীকার ভঙ্গ করেননি বা বিশ্বাসঘাতকতা করেননি।
শেষ বাক্যে তিনি সবাইকে অনুরোধ করেন—“গাজাকে ভুলে যেও না। আর দোয়া করো যেন আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করেন ও কবুল করেন।”
আনাস আল-শরীফের জীবন ও মৃত্যু বিশ্বকে মনে করিয়ে দেয়—একজন সাংবাদিক শুধু সংবাদ পরিবেশক নন, তিনি হতে পারেন একটি জাতির সংগ্রামের প্রতীক। তাঁর শেষ বার্তা আজও কোটি মানুষের হৃদয়ে অনুরণিত হচ্ছে, গাজার প্রতিটি ধ্বংসস্তূপে তাঁর কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।


