বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু নাম আছে, যেগুলো আলাদা করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। খালেদা জিয়া তেমনই এক নাম। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তাঁর জীবন, লড়াই, সাফল্য আর বিতর্ক জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের রাজনীতির প্রতিটি বাঁকে। এক সময় যিনি রাজনীতিতে আসতেই চাননি, সেই ‘পুতুল’ নামের মেয়েটিই একদিন হয়ে ওঠেন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী—বেগম খালেদা জিয়া।
শৈশব, জন্মস্থান ও পারিবারিক পরিচয়
খালেদা জিয়ার জন্ম ১৯৪৫ সালে, অবিভক্ত দিনাজপুর জেলার জলপাইগুড়িতে। জন্মের সময় তাঁর নাম রাখা হয়েছিল খালেদা খনম পুতুল। তাঁর বাবা ইসকন্দর আলি মজুমদার ছিলেন চা ব্যবসায়ী। দেশভাগের সময় ব্যবসা ও নিরাপত্তার কথা ভেবে পরিবারসহ তিনি দিনাজপুর শহরে চলে আসেন, যা বর্তমানে বাংলাদেশের অংশ। খালেদার আদি বাড়ি ছিল ফেনী জেলার ফুলগাজিতে এবং মাতৃকুলের বাড়ি ছিল চাঁদবাড়িতে, যা বর্তমানে ভারতের উত্তর দিনাজপুরে অবস্থিত।
এই ভৌগোলিক টানাপোড়েনই যেন তাঁর জীবনের শুরুতেই সীমান্ত পেরোনো বাস্তবতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। যা পরবর্তী সময়ে রাজনীতির কঠিন বাস্তবতার জন্য তাঁকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করে তোলে।
জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহ ও নতুন পরিচয়
১৯৬০ সালে খালেদা পুতুলের জীবন মোড় নেয় পাক সেনাবাহিনীর তৎকালীন ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহের মাধ্যমে। বিয়ের পর স্বামীর নামের অংশ হিসেবে নিজের পদবি গ্রহণ করেন তিনি। সেই থেকেই ‘খালেদা জিয়া’ নামটি প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করে।
১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় স্বামীর সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানেও গিয়েছিলেন তিনি। যুদ্ধ, সেনা জীবন আর অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়েই তাঁর সংসারজীবন গড়ে ওঠে। পরে তাঁরা চট্টগ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।
ফার্স্ট লেডি হলেও রাজনীতিতে অনীহা
১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হলে খালেদা জিয়া হন দেশের ফার্স্ট লেডি। সেই সময় তাঁকে প্রথমবার জনসমক্ষে নিয়মিত দেখা যেতে শুরু করে। তবে তখনও তাঁর রাজনীতিতে কোনো আগ্রহ ছিল না। তিনি ছিলেন অন্তর্মুখী, পর্দানশীন এবং প্রচারবিমুখ।
অনেকেই তখন ভাবেননি, এই নীরব নারীই একদিন দেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবেন।
স্বামীর মৃত্যু ও রাজনীতিতে প্রবেশ
১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমান সেনা অভ্যুত্থানে নিহত হলে খালেদা জিয়ার জীবন পুরোপুরি বদলে যায়। এই ঘটনাই তাঁকে রাজনীতির পথে নিয়ে আসে। তিনি উপলব্ধি করেন, স্বামীর আদর্শ ও দলকে টিকিয়ে রাখতে হলে তাঁকেই সামনে আসতে হবে।
১৯৮২ সালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী পার্টি (বিএনপি)-এর সাধারণ সদস্য হন। পরের বছর সহ-সভাপতির দায়িত্ব পান। ধীরে ধীরে তিনি দলের প্রধান নেতৃত্বে উঠে আসেন।
‘পুতুল’ থেকে ‘বেগম জিয়া’ হয়ে ওঠা
খালেদা জিয়ার ব্যক্তিত্ব ছিল আলাদা। মাথায় ঘোমটা, চোখে বড় রোদচশমা—এই ছিল তাঁর পরিচিত চেহারা। দিনের আলোতে কালো সানগ্লাস আর রাতে মোটা ফ্রেমের চশমার আড়াল থেকে দৃঢ় চোখে তাকিয়ে কথা বলতেন তিনি।
তাঁর কণ্ঠ ছিল গম্ভীর। কথা বলতেন কম, কিন্তু স্পষ্ট। ধীরে ধীরে সেই নীরব ‘পুতুল’ রূপান্তরিত হন শক্তিশালী রাজনৈতিক নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ায়।
এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব
আশির দশকে সেনাশাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনে খালেদা জিয়া বিএনপিকে নেতৃত্ব দেন। একাধিকবার তাঁকে গৃহবন্দি করা হয়। তবুও তিনি পিছু হটেননি।
বিএনপি ছয়টি দলের সঙ্গে জোট গড়ে তোলে। দীর্ঘ আন্দোলনের পর ১৯৯০ সালে গণঅভ্যুত্থানের মুখে এরশাদ ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। এই আন্দোলন খালেদা জিয়াকে জনগণের কাছে একজন সাহসী নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী
১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হলে খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। এটি ছিল দেশের ইতিহাসে এক বড় মাইলফলক।
তিনি মোট তিনবার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন—
১৯৯১ থেকে ১৯৯৬,
১৯৯৬ সালে সংক্ষিপ্ত মেয়াদ,
এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত।
শাসনামল, সাফল্য ও বিতর্ক
খালেদা জিয়ার প্রথম মেয়াদে নারীশিক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। শিক্ষা খাতে বাজেট উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়। এই সময় তাঁর সরকারের কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ প্রশংসা পায়।
তবে ২০০১ সালের পর তাঁর শাসনামল ঘিরে বিতর্ক বাড়তে থাকে। জামায়াতে ইসলামির সঙ্গে জোট গঠন নিয়ে সমালোচনা হয়। অভিযোগ ওঠে মৌলবাদী গোষ্ঠীর প্রভাব বাড়ছে।
দুর্নীতির অভিযোগও তাঁকে বারবার তাড়া করেছে। ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ দুর্নীতির সূচকে শীর্ষে ছিল বলে আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচিত হয়।
শেখ হাসিনার সঙ্গে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বিতা
খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার দ্বন্দ্ব বাংলাদেশের রাজনীতির এক দীর্ঘ অধ্যায়। এই লড়াই শুধু রাজনৈতিক ছিল না, অনেক সময় ব্যক্তিগত পর্যায়েও পৌঁছায়।
দুই নেত্রীর মধ্যে সৌজন্যের প্রকাশ খুব কমই দেখা গেছে। একমাত্র এরশাদবিরোধী আন্দোলনেই তাঁরা এক মঞ্চে দাঁড়িয়েছিলেন। বাকিটা সময় কেটেছে প্রতিদ্বন্দ্বিতায়।
রাজনীতি থেকে ধীরে সরে যাওয়া
২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির বড় পরাজয়ের পর খালেদা জিয়া ধীরে ধীরে রাজনীতির কেন্দ্র থেকে সরে যেতে থাকেন। অসুস্থতা তাঁর সক্রিয় রাজনীতিতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
২০১৮ সালে দুর্নীতির মামলায় কারাদণ্ড হয় তাঁর। চিকিৎসার কারণে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পান। ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি আইনি মুক্তি পান, তবে আর সক্রিয় রাজনীতিতে ফেরেননি।
উত্তরাধিকার ও বিএনপির ভবিষ্যৎ
খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে বিএনপির নেতৃত্বে আছেন তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমান। দলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা প্রশ্ন থাকলেও অনেক নেতা-কর্মী মনে করেন, খালেদা জিয়ার সংগ্রামী জীবনই বিএনপির সবচেয়ে বড় প্রেরণা।
একদা রাজনীতিতে অনাগ্রহী যে ‘পুতুল’, সেই নারীর বেগম খালেদা জিয়া হয়ে ওঠার গল্প আজও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় হয়ে থাকবে।
সূত্র: আনন্দবাজার ডট কম।


