যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক হ্রাস: বাংলাদেশের জন্য বড় স্বস্তি
দীর্ঘ আলোচনার পর যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যের উপর আরোপিত অতিরিক্ত শুল্ক ৩৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশে নামিয়েছে। অর্থাৎ এখন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানিপণ্য গড়ে ৩৫ শতাংশ শুল্কের আওতায় পড়বে, যেখানে আগে এটি ৫০ শতাংশের বেশি ছিল। বিশেষ করে গার্মেন্টস খাত এ সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি স্বস্তি পেয়েছে।
এই শুল্ক কমানোর বিষয়টিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখছে। অর্থনীতিবিদরাও বিষয়টিকে মোটের ওপর ইতিবাচক বলেই মনে করছেন।
কূটনৈতিক সমঝোতা: কীভাবে সম্ভব হলো শুল্ক হ্রাস
শুল্ক হ্রাসের পেছনে কূটনৈতিক আলোচনা বড় ভূমিকা রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আগের আলোচনায় গোপন চুক্তি নিয়ে সমালোচনা হলেও এবার সরকার সমঝোতার স্বার্থে অনেক বিষয় গোপন রেখেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই শুল্ক নীতি শুধু বাণিজ্য নয়, ভূ-রাজনীতি ও কৌশলগত স্বার্থ হিসাবেও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর শর্ত হিসেবে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম, তুলা ও ২৫টি বোয়িং বিমান ক্রয়ের ঘোষণা দিয়েছে। সামরিক সরঞ্জাম আমদানিতেও নতুন শর্ত যোগ হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যদিও এ বিষয়ে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি।
বাংলাদেশের শুল্ক সুবিধা: বড় প্রতিযোগীদের অবস্থা
বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো— ভারত, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়া—এখনো যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের আওতায় আছে। ভারতের জন্য শুল্ক হার ২৫ শতাংশ পর্যন্ত আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে শুল্ক গড়ে ১৯ থেকে ২০ শতাংশ।
এক্ষেত্রে অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করছেন, এই সামান্য ব্যবধানও বাংলাদেশের পক্ষে সুযোগ তৈরি করবে। কারণ এক শতাংশ শুল্ক সুবিধার জন্য বায়াররা পাকিস্তানের মতো দেশে যাবে না। পোশাক খাতে বাংলাদেশের সরবরাহ সক্ষমতা প্রমাণিত।
‘মহাবিপদ’ থেকে ‘সুবর্ণ সুযোগ’
শুরুর দিকে বাড়তি শুল্ককে বাংলাদেশের বড় বিপদ হিসেবে ধরা হয়েছিল। কারণ ৫০ শতাংশ শুল্ক দিলে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যেত। শুল্ক কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি বদলেছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিপদ এখন সুবর্ণ সুযোগ হয়ে উঠেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এই চুক্তিকে ‘ঐতিহাসিক’ উল্লেখ করে বলছেন, এটি বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যকে নতুন গতি দেবে।
কেন শুল্ক হ্রাসের পরও চ্যালেঞ্জ রয়ে যাচ্ছে
শুল্ক কমলেও বাংলাদেশের রপ্তানিতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ থেকেই যাচ্ছে। সিপিডির গবেষক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলছেন, বাড়তি শুল্ক কমায় উদ্যোক্তাদের ওপর চাপ কিছুটা কমবে ঠিকই, তবে মুনাফার অংক খুব বেশি বাড়বে না।
একই সঙ্গে বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল মনে করেন, শুল্ক সুবিধা কাজে লাগাতে হলে বিদ্যুৎ, গ্যাস, ব্যাংকিং সেবা, পোর্ট সুবিধা ও লজিস্টিক খাতের উন্নয়ন জরুরি।
পোশাক খাতে সাপ্লাই চেইন সংকট: বড় বাধা
বাংলাদেশের পোশাক খাতের সমস্যা শুধু শুল্কেই সীমাবদ্ধ নয়। গ্যাসের অপ্রতুলতা, পোর্টের অদক্ষতা ও শ্রমিক অসন্তোষ বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে। অর্ডার ডেলিভারি ঠিকমতো না হলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বাংলাদেশের উপর আস্থা হারাতে পারে।
ড. জাহিদ হোসেনের মতে, সঠিক সময়ে পণ্য ডেলিভারি না হলে বিমানে পণ্য পাঠাতে হয় বা ডিসকাউন্ট দিতে হয়— যা মুনাফা কমায়। পাশাপাশি রাজনৈতিক অস্থিরতা সরবরাহ চেইনকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
‘ট্রান্সশিপমেন্ট ট্যারিফ’ আরেকটি ঝুঁকি
যুক্তরাষ্ট্রের ট্রান্সশিপমেন্ট ট্যারিফ নীতি বাংলাদেশের জন্য আরেকটি চ্যালেঞ্জ। চীন থেকে কাঁচামাল এনে যদি বাংলাদেশে পণ্য তৈরি হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ওই পণ্যের উপর ৪০ শতাংশ ট্রান্সশিপমেন্ট ট্যারিফ আরোপ করতে পারে। ফলে চীনের উপর নির্ভরশীল পণ্যগুলোতে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা কমে যাবে।
কোথায় ছাড় দিলো বাংলাদেশ?
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে খুশি করতে গিয়ে বাংলাদেশ কিছু স্পর্শকাতর বিষয়ে ছাড় দিয়েছে। যেমন চীনের কাছ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কম আমদানি ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে বড় পরিসরে বাণিজ্য করার প্রতিশ্রুতি। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ কোনো বিবরণ প্রকাশ করা হয়নি।
ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, এ ধরনের ‘গোপন চুক্তি’ দেশের অন্য বাণিজ্যিক স্বার্থকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই সরকারকে চুক্তির শর্তগুলো জনসমক্ষে আনার আহ্বান জানান তিনি।
এখন কী করতে হবে?
শুল্ক কমানোর সুযোগকে কাজে লাগাতে হলে বাংলাদেশকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে হবে:
✅ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট সমাধান
✅ পোর্ট ও কাস্টমসের দক্ষতা বৃদ্ধি
✅ শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও কল্যাণ নিশ্চিত
✅ বৈশ্বিক ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখা
✅ নতুন বাজার ও পণ্য বহুমুখীকরণ
উপসংহার
মার্কিন শুল্ক হ্রাস বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে স্বস্তির। তবে এটি একাই যথেষ্ট নয়। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে পোশাক খাত, চামড়া শিল্পসহ রপ্তানি বাণিজ্যকে আরও বিস্তৃত করতে হলে ভেতরের কাঠামোগত সমস্যা সমাধানই এখন মূল চাবিকাঠি।
বাংলাদেশ যদি সঠিক পথে চলে, তবে শুল্ক কমার সুযোগ দেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিতে পারে।


