বিশ্বের নানা প্রাকৃতিক বিস্ময়ের মধ্যে গ্রেট ব্লু হোল (Great Blue Hole) এমন এক বিস্ময় যা সমুদ্রের বুকেই যেন লুকিয়ে রেখেছে ইতিহাসের অধ্যায়। অতিকায় এই নীলচোখ যেন আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে অবিরাম। প্রায় ১৫ হাজার বছর পুরনো এই সমুদ্রগহ্বরকে ঘিরে রয়েছে কল্পনা, গবেষণা এবং দুঃসাহসিক অভিযাত্রার অসংখ্য গল্প।
ক্যারিবিয়ান উপকূলের ছোট্ট দেশ বেলিজ (Belize)-এর কাছে এই বিস্ময়কর গর্তটির অবস্থান। রাজধানী নয়, তবে সবচেয়ে বড় শহর বেলিজ সিটি (Belize City) থেকে সমুদ্রপথে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে গেলেই চোখে পড়বে সমুদ্রের মাঝখানে নীলচোখের মতো বিশাল গর্ত। এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রাকৃতিক সামুদ্রিক গহ্বর।
আজ যে গ্রেট ব্লু হোলকে আমরা সমুদ্রের মাঝে দেখতে পাই, তা কিন্তু সবসময় জলের নিচে ছিল না। প্রায় ১৫ হাজার বছর আগে পৃথিবীর বরফ গলতে শুরু করলে সমুদ্রের জলস্তর ধীরে ধীরে বেড়ে যায়। তার আগের সময় এই অঞ্চল ছিল স্থলভাগের অংশ।
তখন এখানে ছিল চুনাপাথরে গঠিত একটি বিশাল গুহা (Limestone Cave)। বরফ গলে সমুদ্রপৃষ্ঠ উঁচু হতে শুরু করলে ধীরে ধীরে সেই গুহা জলের তলায় হারিয়ে যায়। গুহার মুখ ভেঙে তৈরি হয় এক বিশাল গোলাকার গর্ত, যা জলে ভরেই আজ নীলচোখের মতো রহস্যময় চেহারা নিয়েছে।
গ্রেট ব্লু হোলের বিস্ময়কর আকৃতি ও আকার সত্যিই অবিশ্বাস্য।ব্যাস প্রায় ১,০৪৩ ফুট, গভীরতা প্রায় ৪১০ ফুট এটি যেন সমুদ্রের বুকের উপর এক অতিকায় চোখ, যা আকাশের প্রতিফলন ধরে নীলাভ আভা ছড়িয়ে দেয়।
বিশ্বজুড়ে বহু স্কুবা ডাইভার (Scuba Diver) এবং সমুদ্রপ্রেমী ভ্রমণকারীদের কাছে গ্রেট ব্লু হোল এক আকর্ষণীয় নাম। গভীর সমুদ্রের গহ্বরে ডুব দিয়ে এখানে দেখা যায় নানা ধরণের স্ট্যালাকটাইট (Stalactite), সামুদ্রিক প্রাণী এবং রহস্যময় প্রাচীন গুহার দেয়াল।
ডাইভিং ছাড়াও নৌকা বা হেলিকপ্টারে করে ওপরে থেকে তাকালেও গ্রেট ব্লু হোলের সৌন্দর্য দর্শনার্থীদের বিমোহিত করে। আকাশ থেকে তাকালে সত্যিই মনে হয় সমুদ্রের বুকে জেগে উঠেছে এক নীল চোখ।
বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন, এই গুহার বয়স কয়েক হাজার বছর। এখানে পাওয়া চুনাপাথরের গঠন প্রমাণ করে, একসময় এটি স্থলভাগের গুহা ছিল। বর্তমানে এটি শুধু ভ্রমণপিপাসু নয়, গবেষকদের কাছেও সমানভাবে আকর্ষণীয়।
জ্যাক কুস্তো (Jacques Cousteau)-এর মতো কিংবদন্তি সমুদ্র গবেষকও একসময় এই গ্রেট ব্লু হোলকে বিশ্বের অন্যতম সেরা ডাইভিং স্পট হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন।
গ্রেট ব্লু হোল ভ্রমণ করতে হলে প্রথমে যেতে হয় বেলিজ সিটিতে। সেখান থেকে সমুদ্রযাত্রায় নৌকায় চেপে কয়েক ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছানো যায় এই বিস্ময়ের কাছে। অনেকে আবার আকাশপথে হেলিকপ্টার ট্যুর করে নীলচোখের আসল রূপ উপভোগ করেন।
গ্রেট ব্লু হোল শুধু একটি প্রাকৃতিক বিস্ময় নয়, এটি পৃথিবীর ইতিহাসের এক অমূল্য দলিল। প্রায় ১৫ হাজার বছরের পুরনো এই সমুদ্রগহ্বর আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতি কতটা শক্তিশালী এবং রহস্যময়। ভ্রমণপিপাসু কিংবা গবেষক—যেই হোক না কেন, একবার গ্রেট ব্লু হোল দেখলে তার স্মৃতি চিরকাল মনের গহ্বরে থেকে যায়।
👉 তাই যদি কখনও প্রকৃতির অদ্ভুত সৌন্দর্যকে কাছ থেকে দেখতে চান, তবে গ্রেট ব্লু হোল হতে পারে আপনার ভ্রমণ তালিকার অন্যতম সেরা গন্তব্য।


