মাত্র ৪৮ ঘণ্টা। কিন্তু এই দুই দিনেই মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র যেন আগুনে জ্বলতে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা, ইরানের সর্বোচ্চ নেতার নিহত হওয়া, পাল্টা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ, নিরীহ মানুষের মৃত্যু—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। শুধু আঞ্চলিক নয়, এই সংকট বিশ্ব রাজনীতিকেও কাঁপিয়ে দিয়েছে।
শনিবার ভোরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় একযোগে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। ওই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা Ayatollah Ali Khamenei নিহত হন বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। তেহরানের আরও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা প্রাণ হারান।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump হামলার পরপরই জানান, এটি ছিল একটি ‘প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ’। তাঁর ভাষায়, এটি ইরানের জনগণের জন্য “দেশ পুনরুদ্ধারের সবচেয়ে বড় সুযোগ”।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনও পরে সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে এবং ৪০ দিনের শোক ঘোষণা করে। রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরান পাল্টা জবাব দেয়। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়ে আঘাত হানা হয় ইসরায়েলসহ যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশগুলোর দিকে। বাহরাইন, দুবাই, কাতার, কুয়েত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।
সাইপ্রাসের RAF Akrotiri ঘাঁটির একটি রানওয়েতেও ইরানি ড্রোন আঘাত হানে। সেখানে অবস্থানরত ব্রিটিশ সেনা সদস্যদের পরিবারকে দ্রুত সরিয়ে নেওয়া শুরু হয়েছে। যুক্তরাজ্য সরকার আগে মার্কিন হামলার অনুমতি না দিলেও এখন ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে।
প্রায় ৯৪ হাজার ব্রিটিশ নাগরিক বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে আটকা পড়েছেন। ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তর তাদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনতে বড় ধরনের উদ্ধার অভিযান শুরু করেছে।
এই সংঘাতের সবচেয়ে মর্মান্তিক দিক হলো বেসামরিক মানুষের মৃত্যু। ইরানে একটি স্কুলে হামলায় প্রায় ১৫০ কিশোরী নিহত হয়েছে বলে জানা গেছে। স্কুল ভবনটির পাশে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের একটি স্থাপনা ছিল।
অন্যদিকে ইসরায়েলে এক হামলায় অন্তত ৯ জন নিহত হয়েছেন। যুদ্ধের আগুনে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি পুড়ছে—এটাই বাস্তবতা।
ইরানের পাল্টা হামলায় তিনজন মার্কিন সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, সামনে আরও হতাহতের আশঙ্কা রয়েছে।
আরব সাগরে দীর্ঘদিন ধরে অবস্থান করছিল মার্কিন বিমানবাহী রণতরী USS Abraham Lincoln এবং তার সহগামী যুদ্ধজাহাজগুলো। কয়েক সপ্তাহ ধরেই যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছিল। সবকিছু যেন বড় সংঘর্ষের প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিচ্ছিল।
তবে পেন্টাগনের কিছু ব্রিফিংয়ে বলা হয়েছে, ইসরায়েল আগে হামলা না করলে ইরান নাকি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সরাসরি আক্রমণের পরিকল্পনা করছিল না। এতে ‘তাৎক্ষণিক হুমকি’ সংক্রান্ত মার্কিন দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক তথ্য সামনে আসে।
সোমবার পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী Hezbollah ইসরায়েলের সঙ্গে সীমান্তে ক্ষেপণাস্ত্র বিনিময় শুরু করে। এতে যুদ্ধ এখন আঞ্চলিক রূপ নিচ্ছে।
কুয়েতের আকাশে কয়েকটি মার্কিন এফ-১৫ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। পাইলটরা প্যারাশুটের মাধ্যমে নিরাপদে নেমে আসেন।
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা, আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর সমর্থন প্রত্যাহার এবং অভ্যন্তরীণ দমননীতি বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছিল। আলোচনা চললেও অচলাবস্থা কাটেনি।
ইরান আবারও পরিষ্কার করে দিয়েছে, তারা এখনই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে আলোচনায় বসতে আগ্রহী নয়। ফলে দ্রুত সমাধানের সম্ভাবনা কমে যাচ্ছে।
তেহরান উত্তর ইরাক সীমান্তে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করেছে। কুর্দি বিদ্রোহীদের মাধ্যমে অস্ত্র পাচার ঠেকাতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর পর ইরানের অভ্যন্তরে নেতৃত্ব সংকট তৈরি হয়েছে। বর্তমানে একটি অস্থায়ী পরিষদ দেশ পরিচালনা করছে। এই পরিষদে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট Masoud Pezeshkian, বিচার বিভাগের প্রধান Gholam-Hossein Mohseni-Ejei এবং আয়াতুল্লাহ Alireza Arafi।
ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করবে ৮৮ সদস্যের ধর্মীয় পরিষদ ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’।
সংঘাতের প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্য বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় কেন্দ্র। ফলে সেখানে অস্থিরতা মানেই বিশ্ব অর্থনীতিতে ধাক্কা।
শেয়ারবাজারে অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে বিঘ্ন, কূটনৈতিক চাপ—সব মিলিয়ে এই সংকট এখন আর কেবল ইরান-যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন—এই সংঘাত কি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে রূপ নেবে? নাকি কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুলবে?
বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, উত্তেজনা দ্রুত কমার সম্ভাবনা কম। প্রতিশোধ, পাল্টা হামলা আর রাজনৈতিক বক্তব্য—সব মিলিয়ে আগুনে ঘি পড়ছে। সাধারণ মানুষ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। বিশ্ব নেতারা একের পর এক বৈঠক করছেন, কিন্তু মাটির বাস্তবতা ক্রমেই ভয়াবহ হচ্ছে।
মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় মধ্যপ্রাচ্য যে অস্থিরতায় ডুবে গেছে, তা সামাল দিতে হয়তো লাগবে বহু বছর। এই সংঘাত এখন শুধু সীমান্তের লড়াই নয়; এটি শক্তির রাজনীতি, আঞ্চলিক আধিপত্য আর বৈশ্বিক প্রভাবের এক জটিল সমীকরণে পরিণত হয়েছে।
পরিস্থিতি কোন দিকে গড়াবে, তা নির্ভর করছে আগামী কয়েক দিনের সিদ্ধান্তের ওপর। কিন্তু আপাতত, পুরো অঞ্চল যেন দম বন্ধ করা অপেক্ষায়।


