স্বপ্নের ছুটি থেকে যুদ্ধের ভয়! দুবাইয়ে হামলার পর বিমানবন্দরে বিশৃঙ্খলা, পর্যটকদের মরিয়া পালানোর চেষ্টা

মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্য ও পর্যটনকেন্দ্র দুবাই হঠাৎ করেই যেন ভয়ের শহরে পরিণত হয়েছে। মিসাইল আর ড্রোন হামলার আতঙ্কে হাজার হাজার বিদেশি পর্যটক এখন সেখান থেকে বেরিয়ে যেতে মরিয়া চেষ্টা করছেন। বিশেষ করে ব্রিটিশ নাগরিকদের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা এতটাই বেড়েছে যে অনেকেই বলছেন—জীবনে কখনও এমন আতঙ্কের পরিস্থিতিতে পড়েননি।

দুবাইয়ের বিমানবন্দরগুলোতে এখন অদ্ভুত এক বিশৃঙ্খলা। অনেক ফ্লাইট বাতিল হয়েছে, আবার কিছু ফ্লাইটের কোনো নিশ্চয়তা নেই। ফলে হাজার হাজার মানুষ হোটেলে আটকে রয়েছেন, কেউ কেউ আবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিমানবন্দরে বসে অপেক্ষা করছেন—হয়তো কোনোভাবে বাড়ি ফেরার সুযোগ মিলবে।

সাম্প্রতিক হামলায় দুবাই ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিভিন্ন জায়গা লক্ষ্য করে ড্রোন ও মিসাইল ছোড়া হয়েছে। এমনকি বিখ্যাত পর্যটন এলাকা পাম জুমেইরার একটি হোটেলেও আগুন ধরে যায়। এই দৃশ্য দেখে অনেকেই বুঝে গেছেন—যে শহরটাকে তারা বিলাসবহুল ছুটির জায়গা ভেবেছিলেন, সেটাই এখন যুদ্ধের আতঙ্কে ঘেরা।

রাত-দিন শহরজুড়ে সাইরেন বাজছে। মিসাইল সতর্কতার সাইরেন শুনলে মানুষ দ্রুত আশ্রয় খুঁজে নিচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে পর্যটকরা বুঝতে পারছেন না কী করবেন—হোটেলে থাকবেন, না কি কোনোভাবে দেশ ছাড়ার চেষ্টা করবেন।

হামলার পর নিরাপত্তাজনিত কারণে দুবাই বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর ফলে প্রায় ২০ হাজার যাত্রী আটকে পড়েন। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন বিমানবন্দরও কিছু সময়ের জন্য বন্ধ ছিল।

ধীরে ধীরে বিমান চলাচল আবার শুরু হলেও পরিস্থিতি এখনও স্বাভাবিক হয়নি। প্রতিদিন যেখানে প্রায় পাঁচ লাখ যাত্রী দুবাই, দোহা বা আবুধাবির বিমানবন্দর দিয়ে যাতায়াত করেন, সেখানে এখন সীমিত ফ্লাইট চলছে। ফলে যারা বের হতে চাইছেন, তাদের জন্য জায়গা পাওয়া খুব কঠিন হয়ে গেছে।

অনেক ব্রিটিশ নাগরিক এখন আর দুবাই বিমানবন্দরের উপর নির্ভর করছেন না। তারা সড়কপথে ওমান বা সৌদি আরবে গিয়ে সেখান থেকে ফ্লাইট ধরার চেষ্টা করছেন। এই যাত্রা সহজ নয়—সীমান্ত পার হতে হয়, আবার অন্য গাড়ি বদলে বিমানবন্দরে যেতে হয়। পুরো যাত্রা কখনও কখনও আট থেকে বারো ঘণ্টা পর্যন্ত লেগে যায়।

অনেকের জন্য এই যাত্রা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। অসুস্থতা বা শারীরিক সমস্যার কারণে অনেকেই এত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে পারছেন না।

ব্রিটিশ নাগরিক পল হার্ট ও তার স্ত্রী সেই মানুষদের একজন, যারা শুরু থেকেই দুবাইয়ে আটকে পড়েছেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই তারা বাড়ি ফেরার চেষ্টা করছেন, কিন্তু এখনও সফল হননি।

পল বলছিলেন, প্রথমে তাদের ফ্লাইট ছিল ২৮ ফেব্রুয়ারি। তারা বিমানে উঠে বসেও ছিলেন। হঠাৎ ঘোষণা আসে—আকাশপথ বন্ধ। চার ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর সবাইকে নামিয়ে দেওয়া হয়।

এরপর তারা আবার হোটেলে ফিরে যান। কয়েকদিনের জন্য বুকিং বাড়াতে হয়। কিন্তু এখনও তিনি নিশ্চিত নন তার পরের ফ্লাইট আদৌ ছাড়বে কি না।

তার স্ত্রীর গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে, তাই দীর্ঘ সড়কপথে ওমান যাওয়াও তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে তারা এখন কার্যত অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় দেখছেন না।

আরেকজন ব্রিটিশ নাগরিক সু কিং তার মেয়ের পরিবারের সঙ্গে দুবাইয়ে ছিলেন। প্রথম হামলার রাতটা তার কাছে এখনো দুঃস্বপ্নের মতো মনে হয়।

তিনি বলেন, হঠাৎ বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। আকাশে আলো ঝলকাতে দেখা যায়। যদিও অনেক মিসাইল আকাশেই প্রতিরোধ করা হয়, তবু সেই শব্দ আর আলো মানুষকে ভীষণ ভয় পাইয়ে দেয়।

তার নাতি-নাতনিরা ছোট হওয়ায় পুরো পরিস্থিতি বুঝতে পারেনি, তবে বড়দের আতঙ্ক স্পষ্ট ছিল।

তিনি প্রথমে ভেবেছিলেন দ্রুত বাড়ি ফিরবেন। কিন্তু পরে বুঝলেন, পরিস্থিতি এত সহজ নয়।

এই সংকটের মাঝেও কিছু মানুষ নিজেদের উদ্যোগে অন্যদের সাহায্য করছেন। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংস্থার মালিক ডেস স্টিল এমন একজন ব্যক্তি।

তিনি তার ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে আটকে পড়া ব্রিটিশদের নিরাপদে বের করে আনছেন। তার পরিকল্পনা বেশ সরল—হোটেল থেকে যাত্রীদের গাড়িতে তুলে সীমান্ত পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর স্থানীয় ড্রাইভাররা তাদের বিমানবন্দরে পৌঁছে দেন।

এই পুরো ব্যবস্থার খরচ অবশ্য কম নয়। অনেক সময় একজন যাত্রীর জন্য প্রায় আড়াই হাজার পাউন্ড পর্যন্ত লাগছে। তবে অনেক পর্যটকের মতে, এমন বিপদের সময় এটাও যেন একমাত্র ভরসা।

দুবাইয়ে আসা অনেক পর্যটকই মূলত বিলাসবহুল ছুটি কাটাতে এসেছিলেন। শপিং, সমুদ্রসৈকত, পাঁচতারকা হোটেল—সব মিলিয়ে আনন্দময় সময় কাটানোর পরিকল্পনা ছিল।

কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই সেই স্বপ্নের ছুটি বদলে গেছে যুদ্ধের অভিজ্ঞতায়।

অনেকে রাতে সাইরেন শুনে ঘুম থেকে উঠে আশ্রয় খুঁজছেন। কেউ আবার ফোনে পরিবারের উদ্বিগ্ন বার্তা পাচ্ছেন—“তুমি ঠিক আছ তো?”

দুবাইয়ের পোর্ট রশিদে নোঙর করা একটি ক্রুজ জাহাজ থেকেও অনেক যাত্রী নেমে পড়েছেন। তাদের বাসে করে সৌদি আরবের রিয়াদে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেখান থেকে ইউরোপে ফ্লাইট ধরার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

একজন যাত্রী বলছিলেন, প্রথম রাতটা বেশ ভয়ংকর ছিল। দূরে বিস্ফোরণের আলো দেখা যাচ্ছিল। পরে অবশ্য তারা বুঝতে পারেন যে অনেক হামলাই আকাশেই প্রতিহত করা হচ্ছে।

দুবাইয়ে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করা কিছু মানুষ অবশ্য পরিস্থিতিকে একটু শান্তভাবেই দেখছেন। তাদের মতে, শহরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বেশ শক্তিশালী।

কিছু বাসিন্দা বলছেন, বেশিরভাগ মিসাইল ও ড্রোন আকাশেই ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। তাই বড় ধরনের ক্ষতির সম্ভাবনা তুলনামূলক কম।

তবুও অনেকে আপাতত নিরাপদ জায়গায় চলে যেতে চাইছেন।

হামলার এক পর্যায়ে পাম জুমেইরার একটি হোটেলে সরাসরি আঘাত লাগে। এতে আগুন ধরে যায়। সৌভাগ্যবশত অনেক অতিথিকে দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।

একজন আইরিশ দম্পতি সেই হোটেলেই ছিলেন। তারা পরে জানান, বিস্ফোরণের শব্দ শোনার পর মোবাইলে জরুরি সতর্কতা বার্তা আসে। তখনই তারা বুঝতে পারেন কী ঘটেছে।

তাদের নাতনি ভয়ে কেঁপে উঠেছিল। তবে পরে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে তারা আবার স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করেন।

বর্তমানে দুবাইয়ে আটকে পড়া বহু মানুষ প্রতিদিন নতুন খবরের অপেক্ষা করছেন। কেউ বিমানবন্দরে যাচ্ছেন ভাগ্য পরীক্ষা করতে, কেউ আবার হোটেলে বসেই খবর দেখছেন।

অনেকেরই একই কথা—যুদ্ধ কখন শেষ হবে কেউ জানে না, কিন্তু সবাই শুধু একটা জিনিসই চাইছেন… নিরাপদে নিজের ঘরে ফিরে যেতে।

লেটেস্ট আপডেট

যশোরে তেলের হাহাকার! পেট্রোল নেই, অকটেনেও লম্বা লাইন – আসলে কী ঘটছে?

মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক অস্থিরতা ঘিরে জ্বালানি তেলের সংকট হতে পারে—...
00:10:22

“এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম” — ৭ মার্চের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের অজানা ইতিহাস

বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন কিছু দিন আছে, যেগুলো শুধু একটি...

যুক্তরাজ্যের ঘাঁটিতে মার্কিন বি-১ বোমারু মোতায়েন: ইরানে ‘বিগ ওয়ান’ হামলার আশঙ্কা বাড়ছে

মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের...

নেপালে জেন জ়ি ঝড়! বলেন্দ্র শাহের ঐতিহাসিক জয়, ভেঙে পড়ল পুরনো রাজনীতি

নেপালের রাজনীতিতে আবারও বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। দীর্ঘদিনের...

তেল মজুদ করে সংকট তৈরি! যশোরের বাঘারপাড়ায় পেট্রোল পাম্পে অভিযান

বাজারে জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি ও অবৈধ মজুদ...

বাছাই সংবাদ

যশোরে তেলের হাহাকার! পেট্রোল নেই, অকটেনেও লম্বা লাইন – আসলে কী ঘটছে?

মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক অস্থিরতা ঘিরে জ্বালানি তেলের সংকট হতে পারে—...
00:10:22

“এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম” — ৭ মার্চের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের অজানা ইতিহাস

বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন কিছু দিন আছে, যেগুলো শুধু একটি...

নেপালে জেন জ়ি ঝড়! বলেন্দ্র শাহের ঐতিহাসিক জয়, ভেঙে পড়ল পুরনো রাজনীতি

নেপালের রাজনীতিতে আবারও বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। দীর্ঘদিনের...

তেল মজুদ করে সংকট তৈরি! যশোরের বাঘারপাড়ায় পেট্রোল পাম্পে অভিযান

বাজারে জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি ও অবৈধ মজুদ...

গুজবে কান দেবেন না—দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি তেলের মজুত আছে: প্রতিমন্ত্রী

বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের সংকট নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন মহলে...

বিশ্ববাজারে তেলের সংকটের প্রভাব! যশোর সীমান্তে বিজিবির টহল ও নজরদারি জোরদার

সামপ্রতিক বৈশ্বিক অস্থিরতা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে...

লাইনে ভিড়, তর্ক-বিতর্ক! জ্বালানি তেল বিক্রিতে সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত

বিশ্ব রাজনীতির উত্তেজনা এখন সরাসরি প্রভাব ফেলছে জ্বালানি বাজারে।...

উদীচী বোমা হামলার ২৭ বছর: যশোরে মানববন্ধনে উঠল কুশীলবদের মুখোশ উন্মোচনের দাবি

যশোরে উদীচী হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তারা বলেন, ‘২৭ বছর...

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

জনপ্রিয় ক্যাটাগরি