আন্তর্জাতিক চাপ ও খাদ্য সংকটের প্রেক্ষাপটে সহায়তার দাবি
গাজা উপত্যকায় দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ ও অবরোধের ফলে সৃষ্ট ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে ইসরায়েল বলছে, তারা আকাশপথে খাদ্য সহায়তা পাঠানো শুরু করেছে। কয়েক সপ্তাহের আন্তর্জাতিক চাপ এবং অনাহারের হুমকির মুখে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী।
রোববার ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্স (আইডিএফ) জানায়, তারা বিমান থেকে যে ব্যাগ ফেলে তা সাতটি প্যাকেজে বিভক্ত ছিল। এতে ময়দা, চিনি ও টিনজাত খাদ্যসামগ্রী ছিল। তবে এই সহায়তা বিতরণ কতটা কার্যকর হয়েছে তা নিয়ে এখনও প্রশ্ন রয়ে গেছে।
মানবিক করিডর ও আন্তর্জাতিক তদারকি
ইসরায়েল আগেও বলেছিল, তারা জাতিসংঘের কনভয়কে গাজায় প্রবেশে অনুমতি দিতে একটি মানবিক করিডর তৈরির উদ্যোগ নিচ্ছে। তবে বাস্তবে এই করিডর কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের সন্দেহ রয়েছে।
আইডিএফ দাবি করেছে, কোগাট (ইসরায়েলের একটি সামরিক সংগঠন) ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সমন্বয়ে এই আকাশপথে সহায়তা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা কিছু ভিডিও শেয়ার করলেও, সেগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।
ফিলিস্তিনি পক্ষের প্রতিক্রিয়া নেই, অনিশ্চয়তা বিদ্যমান
এই সহায়তা কার্যক্রম সম্পর্কে ফিলিস্তিনের কোনো সরকারি কর্মকর্তার বক্তব্য এখনও পাওয়া যায়নি। তবে গত শনিবার আইডিএফ জানায়, তারা মানবিক পরিস্থিতি উন্নয়নের জন্য কয়েকটি পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ‘মানবিক বিরতি’রও প্রস্তুতি নিচ্ছে।
একইসাথে তারা গাজায় একটি পানি বিশুদ্ধিকরণ প্ল্যান্টে পুনরায় বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার কথা বলেছে, যা ৯ লাখ মানুষের উপকারে আসবে বলে দাবি করেছে। তবে স্থানীয় পর্যায়ে এই সংযোগ বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, সে বিষয়েও রয়েছে বিস্তর সংশয়।
সাহায্যের নামে সহিংসতা ও অপুষ্টির ভয়াবহ চিত্র
গাজায় মানবিক সহায়তার আড়ালে চলমান সহিংসতা ও অপুষ্টির হার বেড়েই চলেছে। হামাস পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, অপুষ্টির কারণে অন্তত ১২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ৮৫ জনই শিশু। বিশ্ব খাদ্য সংস্থার প্রধান গাজা পরিস্থিতিকে ‘মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
তাছাড়া প্রত্যক্ষদর্শীরা বিবিসিকে জানিয়েছেন, প্রতিদিনই ইসরায়েলি গুলিতে নিহত হচ্ছে ফিলিস্তিনিরা। আইডিএফ যদিও দাবি করেছে, তারা “সতর্কতামূলক গুলি” ছুঁড়ছে এবং সহিংসতার জন্য হামাসকে দায়ী করছে, তবে এই ব্যাখ্যা আন্তর্জাতিক মহলে গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে না।
আকাশপথে সহায়তা: কার্যকর না বিপজ্জনক?
জর্ডান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সহযোগিতায় আকাশপথে সহায়তা পাঠানোর পরিকল্পনার বিষয়টি গত শনিবার প্রকাশ্যে আসে। যদিও কিছু আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা বলছে, এই উদ্যোগ প্রকৃত অনাহার পরিস্থিতির মোকাবেলায় খুবই সামান্য ভূমিকা রাখবে।
জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার প্রধান ফিলিপ্পে লাজ্জারিনি বলেন, আকাশপথে সহায়তা “ব্যয়বহুল, অদক্ষ এবং যদি সঠিকভাবে না করা হয়, তাহলে এটি বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।” তিনি জানান, জর্ডান ও মিশরে ৬ হাজার লরি প্রস্তুত আছে, যেগুলো গাজায় প্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা: আকাশপথে সহায়তায় ক্ষতির আশঙ্কা
বিবিসি আরবি বিভাগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজার উত্তরাঞ্চলের অনেক বাসিন্দা আকাশপথে সহায়তা পাঠানোর পদ্ধতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এক বাসিন্দা বলেন, “এই প্রক্রিয়া অনিরাপদ। আগের বছর অনেক দুর্ঘটনা ঘটেছিল। ত্রাণ সামগ্রী তাঁবুতে পড়ে আহত বা প্রাণহানির আশঙ্কা থাকে।”
ডিহাইড্রেশন ও খাদ্য সংকটের সাথে লড়াই
অনাহারের পাশাপাশি গাজার মানুষকে এখন লড়তে হচ্ছে পানির তীব্র সংকট, অর্থাৎ ডিহাইড্রেশনের সাথেও। এক গাজাবাসী মা জানান, “আমরা খাবার ও পানীয় ছাড়া, এমনকি পানি ছাড়াও বাস করছি।” এই বাস্তবতা গাজার মানবিক সংকটের প্রকৃত গভীরতা তুলে ধরে।
ইসরায়েল-হামাস সংঘাতের পটভূমি ও ফলাফল
২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাস ইসরায়েলে হামলা চালিয়ে প্রায় ১,২০০ মানুষ হত্যা করে এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করে। তার জবাবে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে হামাস পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী গাজায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৫৯ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে।
উপসংহার: সহায়তার নামে প্রচারণা না বাস্তব মানবতা?
ইসরায়েলের আকাশপথে সহায়তা কার্যক্রমের মধ্যে একদিকে রয়েছে যুদ্ধের ভয়াবহতা, অন্যদিকে চলছে আন্তর্জাতিক চাপ ও সমালোচনার মধ্যে নিজেদের মানবিক ভাবমূর্তি রক্ষার চেষ্টা। বাস্তবে এই সহায়তা কতটা কার্যকর—তা নির্ভর করছে মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা ও স্থানীয়দের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ওপর।


