গাজায় খাদ্য সংকট চরমে, সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী শিশু ও চিকিৎসকরা
গাজা এখন এক অবর্ণনীয় মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি। ২০ লক্ষেরও বেশি মানুষের জনপদে খাদ্য, পানি এবং চিকিৎসা সামগ্রীর চরম অভাব দেখা দিয়েছে। প্রতিদিন বেড়েই চলেছে অনাহার ও অপুষ্টির দাপটে কঙ্কালসার হয়ে পড়া মানুষের সংখ্যা। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরা—নয় লক্ষেরও বেশি শিশু আজ অপুষ্টির শিকার।
ক্ষুধার্ত চিকিৎসকেরা চিকিৎসা করছেন ক্ষুধার্ত রোগীদের
গাজার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে। দক্ষিণ গাজার নাসের হাসপাতালের চিকিৎসক মহম্মদ সাকের নিজেই চিকিৎসা করতে করতে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। সিএনএনের এক প্রতিবেদনে তিনি জানান, ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে তিনি কিছু খাননি, কেবল পানি পেয়েছিলেন। হাসপাতালের ক্যান্টিনে নেই কোনো খাবার, এমনকি সামান্য চিনি পর্যন্ত অনুপস্থিত।
সাকের বলেন, “আমরা এখন এমন এক অবস্থায় আছি, যেখানে ক্ষুধার্ত মানুষ ক্ষুধার্তদের চিকিৎসা করছেন।”
চিকিৎসকেরা মৃত্যুর মুখে, অস্ত্রোপচারের মাঝেও মৃত্যুর ঘটনা
উত্তর গাজার আল-আহলি আল-আরাবি হাসপাতালের পরিচালক চিকিৎসক ফাদেল নঈম জানান, গত সপ্তাহেই তাঁর হাসপাতালের দু’জন সহকর্মী অস্ত্রোপচারের সময় মারা যান। এর কারণ—চরম ক্লান্তি, অপুষ্টি এবং খাদ্যের ঘাটতি। তিনি বলেন, “আমাদের কাজ এখন শুধু রোগী বাঁচানো নয়, সহকর্মীদের জন্য খাবার জোগাড় করাও আমার দায়িত্ব। কিন্তু খাবার কোথায়?”
এমনকি হাসপাতালের পরিচালক হয়েও ফাদেল বা সাকের দিনে এক বেলার বেশি খাবার পাচ্ছেন না। এভাবে ২৪ ঘণ্টা কাজ করে যাওয়া সম্ভব নয় বলেই আশঙ্কা তাঁদের।
কঙ্কালসার রোগীরা, বাড়ছে হাসপাতালের চাপ
চিকিৎসকদের ভাষায়, এখন যেসব রোগী হাসপাতালে আসছেন, তাঁদের দেখে বোঝা যাচ্ছে না তাঁরা মানুষ না কেবল কঙ্কাল! কারণ, শরীরে মাংস নেই বললেই চলে। রোগীদের দুর্বলতা এতটাই যে অনেকেই কথা বলতে পারছেন না।
বিশেষ করে পাঁচ বছরের নিচের শিশুরা মারাত্মক অপুষ্টিতে ভুগছে। গাজার চিকিৎসা কেন্দ্রগুলির তথ্য বলছে, গত দুই সপ্তাহে শিশুদের মধ্যে অপুষ্টির হার তিন গুণ বেড়ে গেছে।
ইসরায়েলি আগ্রাসনের মধ্যে খাদ্য সঙ্কট আরও ভয়াবহ
গাজায় শুধুই খাদ্য বা ওষুধের অভাব নয়—প্রতিদিন ইসরায়েলি হামলার মুখেও পড়ছেন মানুষ। এই হামলা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। ঘর থেকে বেরোলেই গোলার আঘাতে মৃত্যুর আশঙ্কা, অথচ ঘরে নেই খাবার বা ওষুধ।
রাস্তায় খাবার বা ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে না, কারণ সরবরাহব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। এই অবস্থায় গাজার মানুষ ঘরবন্দি হলেও, জীবন-যুদ্ধ থেমে নেই।
ত্রাণশিবিরও ভরসা নয়, বরং মৃত্যুঝুঁকির স্থান
ত্রাণ পাওয়ার আশায় গাজাবাসীরা ছুটছেন ত্রাণশিবিরে। তবে এই শিবিরেও নেই পর্যাপ্ত খাদ্য কিংবা ওষুধ। গাজা হিউম্যানিটেরিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ)-এর ত্রাণ শিবিরে গিয়েও অনেকে প্রাণ হারাচ্ছেন। তবুও, সামান্য খাবারের আশায় নিজেদের জীবন ঝুঁকির মুখে রেখে ছুটছেন প্যালেস্টাইনিরা।
রাষ্ট্রপুঞ্জের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস গাজার এই পরিস্থিতিকে “ভয়াবহ” বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, সাম্প্রতিক সময়ে এই ধরনের মৃত্যু ও ধ্বংস নজিরবিহীন।
গাজার ভবিষ্যৎ: প্রতিদিন অন্ধকারে আরও এক ধাপ
এই মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যেও সমাধানের কোনো সুস্পষ্ট পথ দেখা যাচ্ছে না। খাদ্য, ওষুধ, চিকিৎসা ব্যবস্থা—সব কিছুই মুখ থুবড়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন, তাত্ক্ষণিকভাবে এবং বৃহৎ পরিসরে।
শিশুদের ভবিষ্যৎ, চিকিৎসকদের সক্ষমতা এবং ২০ লক্ষ গাজাবাসীর জীবনের প্রশ্নে এখন প্রয়োজন দৃঢ় ও মানবিক পদক্ষেপ।


