গাজা উপত্যকাকে পুরোপুরি দখলের পরিকল্পনায় নামছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, আর এই বিতর্কিত ও ভয়ংকর পদক্ষেপে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পূর্ণ সমর্থন পেয়েছেন। বিষয়টি ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ও অস্থিরতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
গাজার পূর্ণ দখলের ঘোষণা
ইসরায়েলের প্রভাবশালী পত্রিকা ইয়েদিওথ আহরোনোথ জানায়, নেতানিয়াহুর এক ঘনিষ্ঠ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেছেন—
“আমরা গাজা উপত্যকা সম্পূর্ণরূপে দখল করতে যাচ্ছি। যেসব স্থানে জিম্মিদের রাখা হয়েছে, সেখানেও সামরিক অভিযান চালানো হবে। সেনাপ্রধান যদি এই সিদ্ধান্তে একমত না হন, তাহলে তার পদত্যাগ করা উচিত।”
এই বক্তব্য ইসরায়েলের গাজা কৌশলে আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়, যা শুধু সীমান্ত অঞ্চল নয়, বরং গাজার ঘনবসতিপূর্ণ কেন্দ্রীয় শরণার্থী শিবির পর্যন্ত আক্রমণ প্রসারিত করতে পারে।
নিরাপত্তা সংস্থার আপত্তি সত্ত্বেও আগ্রাসন অব্যাহত
ইসরায়েলের পাবলিক ব্রডকাস্টার কেএএন সূত্রে জানা গেছে, নেতানিয়াহু সম্প্রতি মন্ত্রিসভার সদস্যদের সঙ্গে আলোচনায় সুরক্ষাবিষয়ক প্রতিষ্ঠানের আপত্তি উপেক্ষা করেই গাজায় অভিযান চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা জানিয়েছেন। তিনি ‘উপত্যকা দখল’ শব্দটি ব্যবহার করে এক ধরনের পূর্ণ সামরিক নিয়ন্ত্রণ কায়েমের ইঙ্গিত দিয়েছেন।
এদিকে চ্যানেল ১২ ও চ্যানেল ১৩-এর খবরে জানানো হয়, এই পদক্ষেপে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর জেনারেল স্টাফের প্রধান ইয়াল জামির যুক্তরাষ্ট্র সফর বাতিল করেছেন। যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পরে এই সামরিক তৎপরতা নতুন মাত্রা নিচ্ছে।
ট্রাম্পের সবুজ সংকেত ও মার্কিন ভূমিকা
ইয়েদিওথ আহরোনোথ-এর দাবি অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে সরাসরি ‘সবুজ সংকেত’ দিয়েছেন গাজায় আক্রমণ জোরদার করার বিষয়ে। ট্রাম্পের এই সমর্থন মূলত নেতানিয়াহুর সরকারের কৌশলগত পরিকল্পনাকে বাস্তবায়নে রাজনৈতিক বৈধতা দিয়েছে।
এর আগে হারেটজ জানায়, গাজার কিছু অংশ পুনরায় দখলের পরিকল্পনা মার্কিন অনুমোদনসহ ইসরায়েলি মন্ত্রিসভার কাছে পেশ করা হয়েছে। এতে স্পষ্ট যে, গাজার ভূখণ্ড পুনরায় নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান।
চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত এবং উত্তেজনা বৃদ্ধি
ইসরায়েলি এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আংশিক জিম্মি মুক্তির বিষয়ে প্রায় চূড়ান্ত চুক্তি থেকে ইসরায়েল সরে এসেছে। তিনি বলেন,
“চুক্তির সুযোগ ইসরায়েল নষ্ট করেছে। নেতানিয়াহুর সরকার দ্রুত এবং কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।”
এই সিদ্ধান্ত শুধু গাজা নয়, বরং গোটা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্লেষণ: এই পরিকল্পনার তাৎপর্য কী?
- মানবিক সংকট আরও গভীর হবে: গাজা উপত্যকায় দীর্ঘদিন ধরেই চলমান সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
- আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়ছে: ইসরায়েলের এই সিদ্ধান্তে হামাসসহ অন্যান্য গোষ্ঠীর প্রতিক্রিয়া আরও সহিংস হতে পারে।
- মার্কিন ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ: ট্রাম্প প্রশাসনের এই সমর্থন মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির নৈপথ্য উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।
উপসংহার: শান্তির বদলে দখলই কি একমাত্র উপায়?
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে গাজা উপত্যকা সম্পূর্ণ দখলের পরিকল্পনা এবং সেই পদক্ষেপে মার্কিন সমর্থনের বাস্তবায়ন অত্যন্ত উদ্বেগজনক। যেখানে আন্তর্জাতিক মহল যুদ্ধবিরতির পথে হাঁটার আহ্বান জানাচ্ছে, সেখানে এই ধরনের আক্রমণ নতুন করে রক্তপাত ও মানবিক বিপর্যয়ের সম্ভাবনা তৈরি করছে।
গাজায় শান্তি ফিরবে কি না, তা এখন নেতানিয়াহুর পরিকল্পনা ও আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার ওপর নির্ভর করছে। কিন্তু যতক্ষণ না গাজা ও ফিলিস্তিনের জনগণের মৌলিক অধিকার এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়, ততক্ষণ এই দখলদারিত্ব শুধু সহিংসতাকেই উসকে দেবে।


