সন্ধ্যা নামতেই আকাশের রং বদলাতে শুরু করল। নীল বা ধূসর নয়, বরং অস্বাভাবিক এক চড়া গোলাপি রঙে ঢেকে গেল গোটা আকাশ। এই দৃশ্য দেখে হতভম্ব হয়ে যান স্থানীয় বাসিন্দারা। কেউ থমকে দাঁড়ান রাস্তায়, কেউ আবার মোবাইল ফোন বের করে ছবি তুলতে শুরু করেন। একে তো তুষারপাত চলছে, তার ওপর এমন রহস্যজনক আকাশ—স্বাভাবিকভাবেই কৌতূহল আর আতঙ্ক দুটোই ছড়িয়ে পড়ে।
হঠাৎ গোলাপি আকাশ, প্রশ্নের ঝড়
সন্ধ্যার পর থেকেই তুষার ঝরছিল। তার মধ্যেই মানুষ লক্ষ্য করেন, আকাশের রং ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। প্রথমে হালকা আভা, তারপর ক্রমশ গাঢ় গোলাপি। রংটা এতটাই চড়া ছিল যে দূরদূরান্তের মানুষও তা স্পষ্ট দেখতে পান। অনেকের প্রথম মনে পড়ে অরোরা বা নর্দার্ন লাইটের কথা। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই প্রশ্ন ওঠে—এই সময়ে তো অরোরার দেখা পাওয়ার কথা নয়।
তাহলে এই আলো এল কোথা থেকে? আকাশে কি কোনও অজানা প্রাকৃতিক ঘটনা ঘটছে? নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনও রহস্য?
জল্পনা-কল্পনার ডানা মেলে
রঙিন আকাশ দেখেই সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়ে যায়। কেউ বললেন, এটি কোনও বিরল আবহাওয়াজনিত ঘটনা। কেউ আবার ভাবলেন, হয়তো মহাজাগতিক কোনও আলো। এমনকি ভিনগ্রহীদের উপস্থিতির কথাও উঠে আসে আলোচনায়। কারণ এমন অস্বাভাবিক দৃশ্য সাধারণত কল্পবিজ্ঞানের গল্পেই দেখা যায়।
ইংল্যান্ডের বার্মিংহাম শহর এবং তার আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে এই গোলাপি আভা দেখা যাওয়ায় রহস্য আরও ঘনীভূত হয়। অনেকেই মনে করেন, যদি ছোট কোনও উৎস হতো, তাহলে এত দূর পর্যন্ত আলো ছড়াত না।
দ্রুত সামনে আসে আসল কারণ
কৌতূহল যখন চরমে, ঠিক তখনই সামনে আসে আসল সত্য। স্থানীয় একটি ফুটবল মাঠের কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দেয়, আকাশের এই অদ্ভুত রঙের পেছনে কোনও মহাজাগতিক বা রহস্যময় কারণ নেই। এর উৎস একেবারেই মাটির কাছেই।
বার্মিংহামের একটি ফুটবল মাঠে সম্প্রতি ঘাস দ্রুত বাড়ানোর জন্য বিশেষ ধরনের এলইডি আলো ব্যবহার করা হচ্ছিল। এই এলইডি আলো সাধারণ সাদা আলো নয়। এগুলো বিশেষভাবে ডিজাইন করা গোলাপি ও বেগুনি আভাযুক্ত আলো, যা ঘাসের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।
ফুটবল মাঠের ঘাসই ‘দোষী’
আধুনিক ফুটবল মাঠে ঘাসের যত্ন নেওয়া একটি বড় বিষয়। বিশেষ করে শীতপ্রধান দেশে, যেখানে সূর্যালোক কম থাকে। ইংল্যান্ডে তাই এলইডি গ্রো লাইট ব্যবহার করার চল বেড়েছে। এই আলো ঘাসকে দ্রুত এবং সমানভাবে বাড়তে সাহায্য করে। ফলে মাঠ দ্রুত খেলার উপযোগী হয়ে ওঠে।
সেই ঘাস বাড়ানোর কাজ চলাকালীন মাঠের বিভিন্ন অংশে শক্তিশালী গোলাপি এলইডি আলো বসানো হয়েছিল। সাধারণ দিনে এই আলো তেমন চোখে পড়ে না। কিন্তু সেদিন সন্ধ্যায় পরিস্থিতি ছিল আলাদা।
তুষারপাত আর আলোর অদ্ভুত মেলবন্ধন
বিশেষজ্ঞরা জানান, তুষারপাতের সময় বাতাসে অসংখ্য বরফকণা ভেসে থাকে। এই কণাগুলো আয়নার মতো কাজ করে। ফলে মাটির কাছ থেকে আসা শক্তিশালী আলো প্রতিফলিত হয়ে আকাশে ছড়িয়ে পড়ে।
গোলাপি এলইডি আলো মূলত লম্বা তরঙ্গদৈর্ঘ্যের। এই ধরনের আলো তুষারের মধ্য দিয়ে সহজেই ছড়াতে পারে। ঠিক এই কারণেই ফুটবল মাঠের আলো প্রতিফলিত হয়ে পুরো আকাশকে গোলাপি রঙে ঢেকে দেয়।
আতঙ্ক কেটে স্বস্তি
আসল কারণ জানা যেতেই স্থানীয় বাসিন্দাদের মনে স্বস্তি ফিরে আসে। ভিনগ্রহী বা অজানা কোনও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা কেটে যায়। অনেকেই হালকা হাসির সঙ্গেই বিষয়টি গ্রহণ করেন—কে ভেবেছিল, নিরীহ ঘাস বাড়ানোর আলো এমন কাণ্ড ঘটাবে!
অনেকে আবার এই ঘটনাকে আধুনিক প্রযুক্তির অপ্রত্যাশিত প্রভাব হিসেবেও দেখছেন। মানুষের দৈনন্দিন কাজে ব্যবহৃত প্রযুক্তি কখনও কখনও যে কতটা অদ্ভুত দৃশ্য তৈরি করতে পারে, এই ঘটনা তারই উদাহরণ।
সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল গোলাপি আকাশ
ঘটনার ছবি আর ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমে। গোলাপি আকাশের নিচে তুষারপাত—এই দৃশ্য অনেকের কাছেই ছিল রূপকথার মতো। কেউ কেউ মজা করে লিখেছেন, “আজ মনে হচ্ছে আমরা অন্য গ্রহে আছি।” আবার কেউ বলছেন, “প্রকৃতি আর প্রযুক্তি একসঙ্গে মিলে কী সুন্দর দৃশ্য বানাতে পারে!”
এই ভাইরাল ছবিগুলো বার্মিংহামকে সাময়িকভাবে হলেও বিশ্বজুড়ে আলোচনায় এনে দেয়।
রহস্য নয়, বিজ্ঞানই শেষ কথা
প্রথম দেখায় রহস্যময় লাগলেও, গোলাপি আকাশের পেছনের কারণ একেবারেই বৈজ্ঞানিক। ফুটবল মাঠের ঘাস বাড়ানোর এলইডি আলো, তুষারপাত এবং আলোর প্রতিফলন—এই তিনের মিলেই তৈরি হয়েছিল সেই অদ্ভুত দৃশ্য।
এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দেয়, অনেক সময় যাকে আমরা রহস্য ভাবি, তার পেছনে থাকে সহজ ব্যাখ্যা। শুধু একটু খোঁজ নিলেই জট খুলে যায়। আর আকাশ ভরে ওঠে গোলাপি আলোয়—ভয়ের নয়, বরং বিস্ময়ের রঙে।


