ভেনেজুয়েলা ও আমেরিকার টানাপোড়েন নতুন মোড় নিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া হুমকির মুখে শেষ পর্যন্ত সুর নরম করল ভেনেজুয়েলা। প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর গ্রেপ্তারির পর যিনি সবচেয়ে বেশি সরব হয়েছিলেন, সেই ডেলসি রড্রিগেজই এবার আমেরিকার সঙ্গে সহযোগিতার আহ্বান জানালেন। রাজনীতির মঞ্চে এই নাটকীয় পালাবদল আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
মাদুরো গ্রেপ্তারির পর ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল ভেনেজুয়েলা
মার্কিন সেনা অভিযানে নিকোলাস মাদুরো গ্রেপ্তার হওয়ার পরই ভেনেজুয়েলা কার্যত অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। মাদুরোর ডেপুটি এবং অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার পর ডেলসি রড্রিগেজ সরাসরি আমেরিকার বিরুদ্ধে তোপ দাগেন। তাঁর ভাষায়, ভেনেজুয়েলা কোনওভাবেই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব মেনে নেবে না।
ডেলসি স্পষ্ট করে জানিয়েছিলেন, মাদুরোর গ্রেপ্তার অবৈধ এবং অবিলম্বে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে দিতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে এই ঘটনার নিন্দা জানানোর আহ্বানও করেছিলেন তিনি। তখন ভেনেজুয়েলার অবস্থান ছিল একেবারেই কঠোর।
ট্রাম্পের পালটা হুঁশিয়ারি, চরম উত্তেজনা
ডেলসির এই অবস্থানের জবাব দিতে সময় নেননি ডোনাল্ড ট্রাম্প। কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি জানান, যদি ডেলসি রড্রিগেজ মার্কিন স্বার্থের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ নেন, তাহলে তাঁর পরিণতি মাদুরোর থেকেও ভয়াবহ হতে পারে।
শুধু কথায় থেমে থাকেননি ট্রাম্প। তিনি প্রকাশ্যে ভেনেজুয়েলার মাটিতে দ্বিতীয় দফা সামরিক হামলার হুঁশিয়ারিও দেন। এই বক্তব্যের পরই পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করে। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, ট্রাম্পের এই হুমকিই ডেলসির অবস্থানে বড় পরিবর্তনের মূল কারণ।
হুমকির পরই সুর বদল ডেলসির
ট্রাম্পের কড়া বার্তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমেরিকার উদ্দেশে বার্তা দেন ডেলসি রড্রিগেজ। সেখানে তাঁর বক্তব্যে আর আগের মতো তীব্রতা দেখা যায়নি। বরং স্পষ্টভাবে সহযোগিতার কথা বলেন তিনি।
ডেলসি লেখেন, “আমেরিকা ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ এবং শ্রদ্ধাশীল সম্পর্ক গড়ে তোলাই আমাদের অগ্রাধিকার। পারস্পরিক সহযোগিতা ও উন্নয়নের লক্ষ্যে আমরা আমেরিকার সরকারের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করতে চাই।”
এই বক্তব্যে স্পষ্ট, আমেরিকার সঙ্গে সংঘাত নয়, বরং সমঝোতার পথেই হাঁটতে চাইছে ভেনেজুয়েলার বর্তমান নেতৃত্ব।
আগের অবস্থানের সঙ্গে সম্পূর্ণ বিপরীত বার্তা
ডেলসির এই বক্তব্য তাঁর আগের অবস্থানের সঙ্গে একেবারেই সাংঘর্ষিক। মাদুরো গ্রেপ্তার হওয়ার পর প্রথম দিকে তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে মাদুরোর জীবিত থাকার প্রমাণ দাবি করেছিলেন। পাশাপাশি মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীর মুক্তির দাবিতে সরব হন।
তখন তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, ভেনেজুয়েলার একমাত্র প্রেসিডেন্ট হলেন নিকোলাস মাদুরো। কোনও অন্তর্বর্তী সরকার বা বাইরের শক্তির সিদ্ধান্ত তিনি মানবেন না। সেই অবস্থান থেকে এত দ্রুত সরে আসা অনেককেই অবাক করেছে।
ট্রাম্পের আগাম ইঙ্গিত, ডেলসির ভবিষ্যৎ ভূমিকা
উল্লেখযোগ্যভাবে, মাদুরো গ্রেপ্তারির পরপরই ডেলসিকে নিয়ে ইতিবাচক মন্তব্য করেছিলেন ট্রাম্প। তিনি জানিয়েছিলেন, ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রড্রিগেজ আমেরিকার সঙ্গে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবেন।
তবে সেই সময় ডেলসি সে পথে হাঁটেননি। বরং আরও কঠোর ভাষায় আমেরিকার সমালোচনা করেছিলেন। কিন্তু ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হুঁশিয়ারির পর সেই পূর্বাভাসই যেন বাস্তব রূপ পেল।
চাপের রাজনীতিতে ভেনেজুয়েলার কৌশল বদল?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেনেজুয়েলা এখন ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং সামরিক হুমকির মুখে পড়ে দেশটির পক্ষে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত চালিয়ে যাওয়া কঠিন।
এই বাস্তবতাই হয়তো ডেলসিকে সুর বদলাতে বাধ্য করেছে। আমেরিকার সঙ্গে সহযোগিতার বার্তা দিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক চাপ কিছুটা হলেও কমাতে চাইছেন বলে মনে করছেন কূটনৈতিক মহল।
আন্তর্জাতিক মহলের নজর ভেনেজুয়েলার দিকে
ডেলসির এই অবস্থান পরিবর্তন শুধু ভেনেজুয়েলা নয়, গোটা লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। আমেরিকা কীভাবে এই সহযোগিতার আহ্বানে সাড়া দেয়, সেটাই এখন দেখার।
একদিকে ট্রাম্পের কড়া হুমকি, অন্যদিকে ডেলসির নরম বার্তা—এই দুইয়ের সমীকরণ ভবিষ্যতে ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক দিকনির্দেশ ঠিক করে দিতে পারে।
শেষ কথা
মাদুরোর গ্রেপ্তারিকে ঘিরে যে উত্তেজনার সূত্রপাত হয়েছিল, ট্রাম্পের এক হুঁশিয়ারিতেই সেখানে নাটকীয় মোড় এল। যিনি একসময় আমেরিকার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি সরব ছিলেন, সেই ডেলসিই এখন সহযোগিতার বার্তা দিচ্ছেন।
রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই—ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ আবারও সেটাই প্রমাণ করল। এখন প্রশ্ন একটাই, এই নরম সুর কি দীর্ঘস্থায়ী হবে, নাকি এটি কেবল সময় কেনার কৌশল?


