ভারতের উত্তরপ্রদেশের নয়ডায় একটি হোটেলে পশ্চিমবঙ্গের এক বাঙালি প্রযুক্তিবিদ ও তার ১৪ বছরের ছেলেকে প্রবেশের অনুমতি না দেওয়ার ঘটনা তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। হোটেল কর্তৃপক্ষের দাবি, স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে বিশেষ নিরাপত্তা নির্দেশনায় বাংলাদেশ, পাঞ্জাব ও কাশ্মীর থেকে আগত অতিথিদের থাকার ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি রূপ নেয় ভাষাগত ও জাতিগত বৈষম্যের এক স্পষ্ট উদাহরণে।
ঘটনাটি ঘটে মঙ্গলবার, ১২ আগস্ট, নয়ডার ৪৪ নম্বর সেক্টরের ‘মীরা এটারনিটি’ নামের একটি হোটেলে। ওই বাঙালি প্রযুক্তিবিদ ‘ওয়ো’ অ্যাপের মাধ্যমে আগেই দুই রাতের জন্য রুম বুক করেছিলেন। তিনি ও তার ছেলে—যিনি একজন জাতীয় পর্যায়ের স্কেটার—প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে নয়ডায় পৌঁছান। কিন্তু হোটেলে প্রবেশের সময় রিসেপশনিস্ট তাদের থামিয়ে দেন।
হোটেল কর্মীরা জানান, স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশ অনুযায়ী স্বাধীনতা দিবসের আগে নিরাপত্তার জন্য বাংলাদেশ, পাঞ্জাব ও কাশ্মীর থেকে আগত অতিথিদের থাকার অনুমতি দেওয়া হবে না। বাঙালি ওই ব্যক্তি জানান, তিনি স্পষ্টভাবে নিজের পরিচয় দেন যে তিনি পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা, বাংলাদেশি নন। কিন্তু রিসেপশনিস্টের বক্তব্য ছিল—“বাঙালি আর বাংলাদেশির মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।” এই মন্তব্যে হতবাক হয়ে যান ওই প্রযুক্তিবিদ।
নয়ডা পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশ থেকে আগত অতিথিদের পরিচয়পত্র যাচাইয়ের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, তবে পশ্চিমবঙ্গ বা অন্য কোনো রাজ্যের মানুষের ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল না। এতে বোঝা যায়, হোটেল কর্তৃপক্ষ নিজস্ব ভুল ব্যাখ্যা ও পক্ষপাতদুষ্ট মনোভাবের কারণে এই বৈষম্যমূলক আচরণ করেছে।
এই ঘটনার পর ‘ওয়ো’ কর্তৃপক্ষ প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেছে। তারা জানিয়েছে, বিষয়টি তদন্ত করে ‘মীরা এটারনিটি’ হোটেলকে তাদের প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণ রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।
এ ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বাঙালিদের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান জাতিবিদ্বেষেরই প্রতিফলন। বিশেষ করে বাংলাভাষীদের নিয়ে ভুল ধারণা, বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করা, এবং সেই কারণে অপমান বা হেনস্থার শিকার হওয়ার ঘটনা বেড়েই চলেছে।
এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিন্দার ঝড় ওঠে। অনেকে মন্তব্য করেন, ভাষা বা জাতিগত পরিচয়ের কারণে কাউকে বৈষম্যের শিকার করা গণতান্ত্রিক সমাজে লজ্জাজনক। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এমন আচরণ শুধু আইনের পরিপন্থীই নয়, বরং দেশের ঐক্য ও সামাজিক সম্প্রীতির জন্যও হুমকিস্বরূপ।
নয়ডার এই ঘটনা স্পষ্ট করে দেয় যে ভাষাগত ও জাতিগত বৈষম্যের বিরুদ্ধে আইন যতই থাকুক, মানসিকতার পরিবর্তন ছাড়া সমাধান সম্ভব নয়। প্রশাসন ও হোটেল ব্যবসায়ী মহলকে এ বিষয়ে আরও সতর্ক হতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কারও সঙ্গে এমন অন্যায় আচরণ না ঘটে।


