ভারত-আমেরিকা সম্পর্ককে বহু বছর ধরেই ‘স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ’ হিসেবে দেখা হয়ে এসেছে। কিন্তু সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভারতবিরোধী মনোভাব প্রকাশ্যে এসেছে, যার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে।
মার্কিন বিদেশ সচিব মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, ভারত রাশিয়া থেকে তেল কেনা অব্যাহত রেখেছে, যা ইউক্রেন যুদ্ধের আবহে পশ্চিমা জোটের নিষেধাজ্ঞার মুখে বড় প্রশ্নচিহ্ন তুলেছে। তার জেরে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরক্তি বেড়েছে।
রাশিয়ার তেল কেনা নিয়ে ট্রাম্পের অস্বস্তি
মার্কো রুবিও একটি সাক্ষাৎকারে বলেন, “ভারত রাশিয়ার সস্তা তেল কিনে নিজের অর্থনৈতিক চাহিদা মেটাচ্ছে, যা অপরাধ নয়, কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ে এটি পুতিনের যুদ্ধ প্রচেষ্টায় পরোক্ষভাবে সহায়তা করছে।”
- রাশিয়া বিশ্ববাজারের তুলনায় তেল কম দামে দিচ্ছে কারণ তারা নিষেধাজ্ঞার কবলে।
- ভারত সেই তেল কিনে নিজস্ব চাহিদা পূরণ করছে, তবে এতে মার্কিন কূটনীতি ব্যর্থ হচ্ছে বলেই মনে করছেন ট্রাম্প।
রুবিওর বক্তব্য, “ভারতের জ্বালানি চাহিদা প্রকৃতপক্ষে বিশাল। কিন্তু রাশিয়ার বিকল্প থাকা সত্ত্বেও সেখানে কেনা চালিয়ে যাওয়া দুঃখজনক।”
২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক: ভারতকে চাপের মুখে ফেলছে আমেরিকা
২০২৫ সালের নির্বাচনের আগে আমেরিকা চায় নিজস্ব অর্থনীতিকে সুরক্ষা দিতে। সেই লক্ষ্যে ১ আগস্ট থেকে ট্রাম্প প্রশাসন ভারতের ওপর ২৫% আমদানি শুল্ক বসিয়েছে।
এই সিদ্ধান্ত সরাসরি ভারতীয় রপ্তানিকারক শিল্প, বিশেষ করে ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, কৃষিপণ্য, এবং বস্ত্রশিল্পকে বড় ধাক্কা দিয়েছে।
এটা ট্রাম্পের ভারতের প্রতি অসন্তোষের আরও একটি বহিঃপ্রকাশ, যা বাণিজ্যিক যুদ্ধের ইঙ্গিতও দিচ্ছে।
বাণিজ্য চুক্তি থমকে, কৃষি খাতে মার্কিন হস্তক্ষেপে অনড় নয় ভারত
ভারত-আমেরিকার মধ্যে বহুদিন ধরেই একটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা চলছে, কিন্তু তা কার্যকর হয়নি। এর অন্যতম প্রধান কারণ—
- আমেরিকা চায়, ভারতের কৃষি, দুগ্ধ এবং খাদ্য উৎপাদন খাতে তাদের কোম্পানিগুলিকে প্রবেশাধিকার দিতে।
- কিন্তু মোদি সরকার কৃষি খাতের কর্পোরেটাইজেশন নিয়ে বরাবরই সাবধানী।
- অতীতে কৃষি আইন নিয়ে দেশজুড়ে কৃষক আন্দোলনের ভয়াবহ স্মৃতি এখনও তাজা, তাই কেন্দ্র কোনও ঝুঁকি নিতে চাইছে না।
এই পরিস্থিতিতে আমেরিকার চাহিদা অনুযায়ী ভারতের নীতিতে নমনীয়তা না দেখানো ট্রাম্প প্রশাসনের বিরক্তির আরও একটি কারণ হয়ে উঠেছে।
মোদি সরকারের অবস্থান: জাতীয় স্বার্থেই অনড়তা
ভারত সরকারের একাধিক সূত্র জানিয়েছে—
- দেশীয় কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে কোনও বহুজাতিক সংস্থাকে পুরো নিয়ন্ত্রণের অধিকার দেওয়া হবে না।
- মার্কিন কোম্পানিগুলির প্রবেশে কৃষকের আত্মনির্ভরতা ও বাজারে লুটপাটের আশঙ্কা রয়েছে, যা অগ্রহণযোগ্য।
- অতীতে কৃষি বিল প্রত্যাহার করার মতো নজির রয়েছে, তাই এ নিয়ে সরকার আরও সতর্ক।
গ্লোবাল ভূ-রাজনীতিতে ভারতের অবস্থান: ভারসাম্যের কৌশল
ভারতের বিদেশনীতি বরাবরই গণতান্ত্রিক ও বহুমুখী সম্পর্কের উপর নির্ভরশীল।
- রাশিয়া ভারতের অন্যতম প্রধান জ্বালানি এবং প্রতিরক্ষা সরবরাহকারী দেশ।
- একইসঙ্গে, আমেরিকার সঙ্গেও অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক বজায় রয়েছে।
- কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধের আবহে রাশিয়ার বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নেয়নি ভারত, বরং জাতীয় স্বার্থের নিরিখে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছে।
এই অবস্থান মার্কিন কূটনীতিকদের কাছে ‘অপ্রত্যাশিত’ ও ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলেই মনে হয়েছে।
ট্রাম্পের বিরক্তি কি সম্পর্কের অবনতি ঘটাবে?
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই মনোভাব সম্পর্কের অবনতির ইঙ্গিত দিতে পারে।
- তবে ভারত এককভাবে কোনও পক্ষ নেবে না—এই অবস্থান বরাবর স্পষ্ট।
- আমেরিকা যদি আলোচনার মাধ্যমে বাণিজ্য ও ভূ-কৌশলগত দ্বন্দ্ব মেটাতে চায়, তবে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আবার আগের জায়গায় ফিরতে পারে।
উপসংহার: বাণিজ্য, ভূ-রাজনীতি ও আত্মনির্ভরতার টানাপোড়েন
ভারত ও আমেরিকার সম্পর্ক এক জটিল সমীকরণে বাঁধা। একদিকে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের পুরনো কূটনৈতিক সম্পর্ক, অন্যদিকে আমেরিকার চাপে মাথা না নত করার কৌশল—সব মিলিয়ে ট্রাম্পের বিরক্তি শুধু প্রতীকী নয়, ভবিষ্যতের কূটনীতিতেও তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
ভারতের জ্বালানি চাহিদা, কৃষকস্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখা মোদি সরকারের কাছে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ট্রাম্পের চাপ, শুল্ক আরোপ বা আন্তর্জাতিক বিবৃতি ভারতের নীতিকে বাধ্য করতে পারবে কিনা, তা সময়ই বলবে।


