বাংলাদেশের সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের পর সরকার গঠনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে বিএনপি। নতুন সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান ঘিরে ইতোমধ্যেই দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারি এই গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এই অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে শুধু দেশের রাজনৈতিক মহল নয়, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলেও চলছে নানা আলোচনা।
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আমন্ত্রণ জানানোর খবর। বিএনপির নেতৃত্বে সম্ভাব্য নতুন সরকার যে আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে নতুনভাবে সাজাতে চায়, এই আমন্ত্রণ সেই বার্তাই বহন করছে বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক।
১৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যেই সব প্রস্তুতি প্রায় শেষের দিকে। নতুন নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা ওই দিন সকালে শপথ নেবেন। পরে দিনের শেষভাগে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যরা।
সরকারি সূত্র জানায়, সংসদ সদস্যদের শপথ নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শেখ আবদুর রশিদ। পুরো আয়োজনটি পরিচালনার দায়িত্বে থাকবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার।
শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হবে ঢাকার ঐতিহাসিক জাতীয় সংসদ ভবন প্রাঙ্গণে। এই স্থানটি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত, তাই এখানেই নতুন সরকারের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হবে।
নতুন সরকারের এই শপথ অনুষ্ঠানকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস জানিয়েছেন, অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার জন্য ১৩টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
আমন্ত্রিত দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে ভারত, চিন, সৌদি আরব, পাকিস্তান, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কাতার, মালয়েশিয়া, ব্রুনেই, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, মালদ্বীপ এবং ভুটান।
এই আমন্ত্রণ তালিকা থেকে বোঝা যায়, দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে নতুন সরকার শুরু থেকেই গুরুত্ব দিতে চায়।
ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়টি কূটনৈতিক মহলে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে বহুস্তরীয়। অর্থনীতি, বাণিজ্য, নিরাপত্তা এবং সাংস্কৃতিক যোগাযোগ—সব ক্ষেত্রেই এই সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ।
বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে চায়। জাতীয় নির্বাচনে জয়ের পর শুভেচ্ছা জানিয়ে পাঠানো বার্তার জবাবে বিএনপি প্রকাশ্যে কৃতজ্ঞতাও জানিয়েছে।
এতে স্পষ্ট বার্তা রয়েছে যে, পারস্পরিক সম্মান, সংবেদনশীলতা এবং আঞ্চলিক শান্তির বিষয়গুলোকে সামনে রেখে দুই দেশ সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চায়।
নির্বাচনে জয়ের পরই তারেক রহমানের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন নরেন্দ্র মোদি। সেই কথোপকথনে দুই দেশের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন তিনি।
এই ঘটনাকে অনেকেই নতুন সম্পর্কের সূচনা হিসেবে দেখছেন। কারণ, রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় দুই দেশের পারস্পরিক যোগাযোগ ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
যদিও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, তবুও ভারতের প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে সরাসরি উপস্থিত থাকবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। সূত্র বলছে, ওই দিন তাঁর অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি থাকতে পারে। মুম্বইয়ে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইম্যানুয়েল ম্যাক্রোঁর সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠকের কারণে তিনি ঢাকায় আসতে নাও পারেন।
তবে তিনি না এলে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর অথবা উপরাষ্ট্রপতি সি পি রাধাকৃষ্ণণ।
রাজনৈতিক মহলে এখন সবচেয়ে বড় আলোচনা হচ্ছে তারেক রহমানের সম্ভাব্য নেতৃত্ব নিয়ে। তিনি দেশের প্রথম পুরুষ সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন বলে জোর আলোচনা চলছে।
তিনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা নেত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং দলের ভেতরে শক্ত অবস্থানের কারণে অনেকেই মনে করছেন, তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি নতুন এক রাজনৈতিক অধ্যায় শুরু করতে পারে।
নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের আমন্ত্রণকে কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বরং এটি ভবিষ্যৎ সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত বলে মনে করছেন কূটনীতিকরা।
গত কয়েক বছরে রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে দুই দেশের সম্পর্কের কিছু জায়গায় টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল বলে আলোচনা ছিল। সেই প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের অধীনে সম্পর্ক কোন দিকে যাবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
যদি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি ঢাকায় উপস্থিত থাকেন, তাহলে সেটি দুই দেশের মধ্যে নতুন করে সহযোগিতার বার্তা দেবে।
শুধু ভারত নয়, দক্ষিণ এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশের অংশগ্রহণ এই শপথ অনুষ্ঠানকে একটি বড় আঞ্চলিক ঘটনায় পরিণত করেছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, নতুন সরকার আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়ে শুরু করতে চায়।
বিশেষ করে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শ্রমবাজার ও নিরাপত্তা সহযোগিতা—এসব ক্ষেত্রে এই আমন্ত্রণগুলো ভবিষ্যতের কূটনৈতিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ধরা হচ্ছে।
১৭ ফেব্রুয়ারির এই শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান শুধু একটি রাজনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক যাত্রার সূচনা। তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত হতে যাওয়া সরকারের প্রথম বড় আন্তর্জাতিক বার্তা হবে এই আয়োজন।
কারা আসবেন, কে থাকবেন না—এসব নিয়ে জল্পনা চললেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নতুন সরকার শুরুতেই আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিক কোন পথে যাবে, তা নির্ভর করবে এই প্রথম দিকের পদক্ষেপগুলোর উপর।
সব মিলিয়ে বলা যায়, এই শপথ অনুষ্ঠান শুধু দেশের রাজনীতিতেই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক মানচিত্রেও নতুন আলোচনার জন্ম দিতে চলেছে।


