জম্মু ও কাশ্মীরে গত কয়েক দিনে টানা ভারী বর্ষণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। বিশেষত মঙ্গলবার সেখানে ১১৫ বছরের মধ্যে সর্বাধিক বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। সরকারি সূত্র জানায়, একদিনে ৩৮০ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়, যা ১৯১০ সালের পর সর্বোচ্চ। এর ফলে হড়পা বান, ভূমিধস ও সেতু ভাঙনের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। শ্রীনগরে ঝিলম নদীর জল বিপদসীমার কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ায় বন্যার আশঙ্কা আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
মঙ্গলবার জম্মুর রেইসি জেলার অর্ধকুঁয়ারী এলাকায় ইন্দ্রপ্রস্থ ভোজনালয়ের কাছে ভয়াবহ ধস নামে। সেই সময় বৈষ্ণোদেবী মন্দিরগামী অসংখ্য পুন্যার্থী যাত্রাপথে ছিলেন। আকস্মিক ধসে মুহূর্তেই চাপা পড়েন বহু মানুষ। এখন পর্যন্ত অন্তত ৩৪ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও অনেকে। পাশাপাশি ডোডা জেলায় বৃষ্টি ও হড়পা বানে প্রাণ হারান চারজন। সবমিলিয়ে দুর্যোগে ৩৮ জনের মৃত্যুর খবর মিলেছে।
ধসে নিহতদের দেহ কাটরা থেকে জম্মুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে আনা হয়েছে। ইতিমধ্যে ১৮ জনের দেহ শনাক্ত করা গেছে। নিহতদের মধ্যে পঞ্জাব, দিল্লি, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ এবং উত্তরপ্রদেশের বাসিন্দারা রয়েছেন। কাটরার স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে অন্তত ১৩ জন আহত পুন্যার্থীকে। তাঁদের দেখতে হাসপাতালে ছুটে যান জম্মু ও কাশ্মীরের লেফটেন্যান্ট গভর্নর মনোজ সিংহ। তিনি আহতদের চিকিৎসা ও নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। নিহতদের প্রতিটি পরিবারকে ৯ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করা হয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে—যখন আগাম দুর্যোগের সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল, তখন কেন বৈষ্ণোদেবী যাত্রা চালু রাখা হয়েছিল? এ বিষয়ে প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লা। তাঁর বক্তব্য, আবহাওয়া অফিস কয়েক দিন আগেই বিপর্যয়ের আশঙ্কার কথা জানিয়েছিল। সেই অবস্থায় পুন্যার্থীদের যাত্রায় অনুমতি দেওয়া কি সঠিক ছিল? কেন তাঁদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হলো না? কেন যাত্রাপথ সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি? প্রশাসনের এই সিদ্ধান্ত নিয়েই এখন উঠছে একের পর এক প্রশ্ন।
বিখ্যাত বৈষ্ণোদেবী মন্দিরটি জম্মুর ত্রিকূট পাহাড়ে অবস্থিত। এই যাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে শ্রী মাতা বৈষ্ণোদেবী শ্রাইন বোর্ড, যার চেয়ারম্যান হলেন লেফটেন্যান্ট গভর্নর মনোজ সিংহ। মন্দিরে পৌঁছানোর জন্য দুটি রাস্তা রয়েছে। ভূমিধসের পর একটি পথ বন্ধ করে দেওয়া হলেও অপর পথ দিয়ে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত পুন্যার্থীদের যেতে দেওয়া হয়। পরে দ্বিতীয় পথটিও বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং ঘোষণা করা হয় পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত যাত্রা স্থগিত থাকবে।
টানা ভারী বৃষ্টিতে জম্মুর বহু এলাকায় সেতু, সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। তাওয়ি নদীর উপর নির্মিত একটি সেতু ভয়াবহ হড়পা বানে ভেঙে পড়ে। জম্মু-শ্রীনগর, জম্মু-পাঠানকোটসহ একাধিক জাতীয় সড়কে যান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষ ও পুন্যার্থীরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।
ভূমিধস ও বন্যায় আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে দ্রুত নামানো হয়েছে জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (NDRF), রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা দল, সেনা ও পুলিশকে। নৌকার সাহায্যে হাজারো মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরানো হয়েছে। ইতিমধ্যে পাঁচ হাজারেরও বেশি মানুষকে নিম্নাঞ্চল থেকে অন্যত্র স্থানান্তর করা হয়েছে। ইন্টারনেট পরিষেবা বিঘ্নিত হলেও তা দ্রুত স্বাভাবিক করার নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
অন্যদিকে শ্রীনগরে ঝিলম নদীর জলস্তর বিপজ্জনক সীমায় পৌঁছানোয় আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। বিভাগীয় কমিশনার অনশুল গর্গ জানিয়েছেন, নদীর জলস্তর নজরে রাখা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। বন্যার ঝুঁকি বিবেচনা করে দক্ষিণ ও মধ্য কাশ্মীরের সব স্কুল-কলেজ আপাতত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
জম্মু ও কাশ্মীরের এই ভয়াবহ দুর্যোগ আবারও স্মরণ করিয়ে দিল পাহাড়ি এলাকায় যাত্রা ও পর্যটন ব্যবস্থাপনায় কতটা কঠোর সতর্কতা জরুরি। দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা থাকা সত্ত্বেও যাত্রা চালু রাখায় যে বহু প্রাণ ঝরে গেল, তা ভবিষ্যতে প্রশাসনের জন্য বড় শিক্ষা হয়ে থাকবে।


