ভারতে যৌন সম্মতির আইনি বয়স বর্তমানে ১৮ বছর নির্ধারিত আছে। তবে সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টে সিনিয়র আইনজীবী ইন্দিরা জয়সিং এই বয়স কমিয়ে আনার দাবি জানিয়ে যে যুক্তি পেশ করেছেন, তা দেশের আইনি ও সামাজিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এই বিতর্ক কেবল আইনগত বিষয়েই সীমাবদ্ধ নয়; এটি সমাজ, সংস্কৃতি, শিশু অধিকার ও ন্যায়বিচারের এক জটিল গঠনতন্ত্রের অন্তর্নিহিত ইস্যু।
সম্মতির আইনি বয়স: ইতিহাস ও বর্তমান বাস্তবতা
ভারতের ফৌজদারি আইনে প্রথমদিকে যৌন সম্মতির বয়স ছিল মাত্র ১০ বছর (১৮৬০ সাল)। এরপর ১৯৪০ সালে এটি ১৬ বছরে উন্নীত করা হয়। সর্বশেষ, ২০১২ সালে শিশুদের যৌন অপরাধ থেকে সুরক্ষার জন্য গৃহীত Protection of Children from Sexual Offences Act (POCSO) অনুযায়ী এবং পরবর্তীতে ২০১৩ ও ২০২৪ সালে সংশোধিত ফৌজদারি আইনে সম্মতির বয়স ১৮ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে।
ভারতে সম্মতির বয়স ইউরোপ, যুক্তরাজ্য, কানাডার মতো অনেক দেশের তুলনায় বেশি, যেখানে সাধারণত ১৬ বছর নির্ধারিত আছে। এই পার্থক্য ভারতের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও আইনি কাঠামোর প্রতিফলন।
ইন্দিরা জয়সিং-এর যুক্তি ও মামলার সারমর্ম
আইনজীবী ইন্দিরা জয়সিং তার লিখিত যুক্তিতে উল্লেখ করেছেন যে, ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের মধ্যে সম্মতিক্রমে গড়ে ওঠা যৌন সম্পর্ককে শোষণ বা নির্যাতন হিসেবে দেখা উচিত নয়। তাঁর মতে, এই ধরনের সম্পর্ক ফৌজদারি আইনের আওতা থেকে বাদ দেওয়া দরকার, কারণ আইনের মূল উদ্দেশ্য হল শিশুদের শোষণ ও নির্যাতন থেকে সুরক্ষা দেয়া, সম্মতিক্রমে গড়ে ওঠা সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা নয়।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া ও মামলা মোকদ্দমা অভিযুক্তদের জন্য এক প্রকার শাস্তি হয়ে দাঁড়ায়। পাশাপাশি, বিচারকগণ যখন প্রত্যেক মামলাকে আলাদা আলাদা করে বিচার করেন, তখন সিদ্ধান্তে বৈষম্য ও পক্ষপাতিত্বের সম্ভাবনাও বেড়ে যায়।
কেন্দ্র সরকারের অবস্থান ও তার প্রতিবাদ
কেন্দ্র সরকার ইন্দিরা জয়সিংয়ের এই যুক্তির কঠোর বিরোধিতা করেছে। তাদের বক্তব্য, সম্মতির বয়স কমানো হলে ভারতীয় আইনানুযায়ী নাবালক বিবেচিত ১৮ বছরের কম বয়সীদের উপর শোষণ ও নির্যাতনের ঝুঁকি বেড়ে যাবে। এই ধরনের শিথিলতা মানবপাচার, বাল্যবিবাহ ও অন্যান্য যৌন অপরাধের মাত্রাও বাড়িয়ে দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞ ও শিশু অধিকারকর্মীদের মতামত
বিভিন্ন শিশু অধিকারকর্মী মনে করেন, ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের মধ্যে সম্মতিক্রমে গড়ে ওঠা সম্পর্কের পরিধি থেকে আইনগত শাস্তিমূলক প্রক্রিয়া বাদ দিলে তাদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও বিকাশের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে। অন্যদিকে, কিছু বিশেষজ্ঞ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, শোষণের শিকার কিশোর-কিশোরীরা কি তাদের স্বপক্ষে প্রমাণ রাখার সক্ষমতা রাখে এবং আইনি প্রক্রিয়ায় যথাযথ সুরক্ষা পায় কিনা।
শর্মিলা রাজে, ফাউন্ডেশন ফর চাইল্ড প্রোটেকশন-মুসকান-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা, বলেন, ভারতীয় সমাজ জাতি, ধর্ম ও শ্রেণিভিত্তিক বিভাজনে বিভক্ত, যা সম্মতির বয়স সম্পর্কিত আইনের অপব্যবহার বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করে।
আইনি সংস্কারের প্রেক্ষাপট: কর্ণাটক হাইকোর্টের নির্দেশনা
২০২২ সালে কর্ণাটক হাইকোর্ট ভারতের আইন কমিশনকে পকসো আইনের আওতায় সম্মতির বয়স নিয়ে পুনর্বিবেচনা করার নির্দেশ দেয়। আদালত উল্লেখ করে, বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে ১৬-১৮ বছর বয়সীদের মধ্যে সম্মতিক্রমে সম্পর্কের মামলায় বিচারকগণ ন্যায্য বিবেচনা করবেন।
আইন কমিশন ২০২৩ সালে এই সুপারিশ গ্রহণ না করলেও আদালত সুপারিশ অনুযায়ী কিছু ক্ষেত্রে জামিন, খালাস ও মামলার বেকসুর খালাস প্রদান করেছে।
আদালতের সাম্প্রতিক রায় ও সমালোচনা
২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে মাদ্রাজ হাইকোর্ট এক মামলায় ১৭ বছর বয়সী মেয়ের ২৩ বছরের যুবকের সঙ্গে সম্পর্কের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে পূর্বের বেকসুর খালাস রদ করে ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে।
গবেষক শ্রুতি রামকৃষ্ণন এই রায়কে “ন্যায়বিচারের গুরুতর ব্যর্থতা” হিসেবে অভিহিত করেছেন, কারণ এটি শুধুমাত্র আইনের কথার উপর ভিত্তি করে প্রয়োগ করা হয়েছে, বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নয়।
আইন প্রয়োগ ও বিচার প্রক্রিয়ার জটিলতা
ইন্দিরা জয়সিং বলেছেন, আইনি বিচারে শুধুমাত্র ন্যায়বিচারের পক্ষপাতিত্ব যথেষ্ট নয়, কারণ দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া অভিযুক্তদের জন্য মানসিক ও সামাজিক চাপের কারণ হয়। বিশেষ আদালতে পকসো আইনের আওতায় আড়াই লাখের অধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে, যা বিচার ব্যবস্থার ধীরগতি নির্দেশ করে।
আইনজীবী ভুবন রিভু বলেন, বিচার ব্যবস্থায় সংস্কার এবং দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা অপরিহার্য। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের সুযোগ বাড়াতে হবে।
সমাজ ও আইনের সামঞ্জস্যের প্রয়োজনীয়তা
‘হক: সেন্টার ফর চাইল্ড রাইটস’ এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা এনাক্ষী গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, আইনের অপব্যবহার ভয় দেখিয়ে পরিবর্তনের পথ বন্ধ করা উচিত নয়।
তিনি আরও বলেন, আইনগুলো সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে, তা না হলে আইনের কার্যকারিতা ও গ্রহণযোগ্যতা হ্রাস পাবে।
উপসংহার
ভারতে যৌন সম্মতির আইনি বয়স নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘদিনের এবং এটি আইনি, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বহুবিধ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিবেচনার দাবি রাখে।
সম্মতিক্রমে গড়ে ওঠা কিশোর-কিশোরী সম্পর্ককে অপরাধ থেকে মুক্তি দিয়ে ন্যায্য বিচারের পথ সুগম করার দাবি তুলছেন অনেক শিশু অধিকারকর্মী ও আইনজীবী। তবে সরকারের নিরাপত্তার চাহিদাও অগ্রাহ্য করা যায় না।
এই বিষয়টি নিয়ে যথাযথ সমন্বয় ও বিচারব্যবস্থার দ্রুত সংস্কার অপরিহার্য, যাতে কিশোর-কিশোরীরা নিরাপদে তাদের স্বাভাবিক বিকাশের সুযোগ পায়, অপরাধীদের শাস্তিও নিশ্চিত হয়।


