ইন্টারনেটের যুগে ইউটিউব আমাদের জীবনের অনেক সমস্যার সহজ সমাধান দেখায়। রান্না শেখা থেকে গাড়ি সারানো—সবকিছুর ভিডিও সেখানে পাওয়া যায়। কিন্তু সেই ইউটিউবই যখন চিকিৎসার জায়গায় ঢুকে পড়ে, তখন ফল যে কত ভয়াবহ হতে পারে, তারই নির্মম উদাহরণ সামনে এল বিহারের ভাগলপুর জেলার কাহালগাঁওয়ে। ইউটিউব ভিডিও দেখে অস্ত্রোপচারের চেষ্টা করে এক ভুয়ো চিকিৎসক প্রাণ কেড়ে নিলেন এক প্রসূতির। মায়ের মৃত্যু হলেও অবিশ্বাস্যভাবে বেঁচে গেল সদ্যোজাত শিশু।
কোথায় এবং কীভাবে ঘটল মর্মান্তিক ঘটনা
এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটেছে বিহারের ভাগলপুর জেলার কাহালগাঁও থানার অন্তর্গত রসলপুর এলাকায়। মৃত প্রসূতির নাম স্বাতী দেবী। তাঁর বাড়ি ঝাড়খণ্ডের ঠাকুরগাঁথি মোধিয়া গ্রামে। স্বামী পরিযায়ী শ্রমিক হওয়ায় গর্ভাবস্থায় স্বাতী তাঁর মায়ের কাছে রসলপুরে থাকছিলেন। পরিবারের ধারণা ছিল, মায়ের তত্ত্বাবধানে থাকলে মেয়ের যত্ন ভালোভাবে হবে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তই যে এমন ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনবে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।
প্রসব যন্ত্রণা শুরু এবং বেসরকারি ক্লিনিকে ভর্তি
বৃহস্পতিবার গভীর রাতে হঠাৎ করেই স্বাতীর প্রসব যন্ত্রণা শুরু হয়। পরিবারের লোকজন আতঙ্কিত হয়ে তাঁকে দ্রুত স্থানীয় একটি বেসরকারি ক্লিনিকে নিয়ে যান। ক্লিনিকটি ছোট হলেও এলাকার মানুষ সেখানে ভরসা করতেন। সেখানে এক ব্যক্তি নিজেকে চিকিৎসক বলে পরিচয় দেন এবং জানান, স্বাতীর অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। তাঁর দাবি ছিল, এখনই অস্ত্রোপচার না করলে মা ও শিশুর দু’জনেরই বিপদ হতে পারে।
পরিবার তখন চরম মানসিক চাপে ছিল। মেয়ের জীবন বাঁচানোর কথা ভেবে তারা অস্ত্রোপচারের জন্য সম্মতি দেয়। কিন্তু তারা জানত না, যে ব্যক্তি নিজেকে ডাক্তার বলছেন, তিনি আদৌ প্রশিক্ষিত চিকিৎসক নন।
ইউটিউব দেখে অস্ত্রোপচারের অভিযোগ
পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, ওই ব্যক্তি কোনো স্বীকৃত চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ করেননি। বরং তিনি মোবাইলে ইউটিউব খুলে ভিডিও দেখে দেখে অস্ত্রোপচারের চেষ্টা করেন। একদিকে স্বাতী ব্যথায় ছটফট করছিলেন, অন্যদিকে তথাকথিত চিকিৎসক বারবার অপারেশন থামিয়ে ভিডিও দেখতে যাচ্ছিলেন।
এই অবৈজ্ঞানিক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের ফলে স্বাতীর শরীরে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হয়। অস্ত্রোপচারের সময় তাঁর একাধিক অঙ্গ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, রক্ত সরবরাহ বা দক্ষ সহকারীর কোনো ব্যবস্থা সেখানে ছিল না। ধীরে ধীরে স্বাতীর অবস্থা সংকটজনক হয়ে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
মায়ের মৃত্যু, তবু বেঁচে গেল সদ্যোজাত
এই ঘটনার একমাত্র আশ্চর্য দিক হলো, সদ্যোজাত শিশুটি বেঁচে গেছে। সূত্রের খবর অনুযায়ী, শিশুটির শারীরিক অবস্থা আপাতত স্থিতিশীল। তবে মায়ের মৃত্যুর ধাক্কা আর জন্মের পরপরই এমন পরিস্থিতির মধ্যে পড়া—এই দুই মিলিয়ে শিশুটির ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিবারের উদ্বেগ কাটছেই না।
মৃত্যুর পরও সত্য গোপনের চেষ্টা
অভিযোগ এখানেই শেষ নয়। স্বাতীর মৃত্যু হওয়ার পরও ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ পরিবারকে সাফ জানায়নি যে তিনি মারা গেছেন। বরং বলা হয়, তাঁর অবস্থা খুব খারাপ এবং দ্রুত অন্য হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। পরিবার তখনও আশায় বুক বাঁধে। দ্রুত তাঁকে অন্য একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
সেখানকার চিকিৎসকরা পরীক্ষা করে জানান, স্বাতীর মৃত্যু অনেক আগেই হয়েছে। এই কথা শুনেই পরিবার ভেঙে পড়ে। তখনই তাদের সন্দেহ আরও গভীর হয় যে প্রথম ক্লিনিকে ভয়াবহ কিছু ঘটেছে।
ক্লিনিক বন্ধ করে পালাল অভিযুক্ত
পরিবার ও আত্মীয়রা যখন ফিরে এসে প্রথম ক্লিনিকের সামনে যান, তখন তারা দেখেন ক্লিনিক বন্ধ। অভিযুক্ত ভুয়ো চিকিৎসক পালিয়ে গেছেন। এই দৃশ্য দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়েন মৃতার পরিবারের সদস্যরা। স্থানীয় বাসিন্দারাও তাদের সঙ্গে বিক্ষোভে সামিল হন।
খবর পেয়ে রসলপুর থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে পুলিশ মৃতদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়। একই সঙ্গে অভিযুক্তদের খোঁজে তল্লাশি শুরু হয়।
ভুয়ো চিকিৎসক এবং গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভয়াবহ চিত্র
এই ঘটনা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকায় ভুয়ো চিকিৎসকদের দৌরাত্ম্য কতটা ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে। অনেক জায়গায় মানুষের কাছে সরকারি হাসপাতাল দূরে, বেসরকারি হাসপাতাল ব্যয়বহুল। সেই সুযোগেই কিছু অযোগ্য মানুষ নিজেদের চিকিৎসক পরিচয় দিয়ে ক্লিনিক চালায়।
সাধারণ মানুষ বিপদে পড়ে যাচাই না করেই তাদের উপর ভরসা করে। আর সেই ভরসার মূল্য দিতে হয় জীবন দিয়ে। ইউটিউব বা ইন্টারনেট কোনোভাবেই চিকিৎসা শিক্ষার বিকল্প হতে পারে না—এই সত্য আবারও নির্মমভাবে প্রমাণিত হলো।
পরিবারের দাবি এবং প্রশাসনের ভূমিকা
স্বাতীর পরিবার অভিযুক্তদের কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, এই ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা বন্ধ হবে না। পুলিশ জানিয়েছে, তারা বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে এবং দোষীদের আইনের আওতায় আনা হবে।
প্রশাসনের পাশাপাশি সমাজেরও এখানে বড় ভূমিকা আছে। শুধু পুলিশি ব্যবস্থা নয়, সাধারণ মানুষকে সচেতন করাও জরুরি। কোথায় চিকিৎসা করাবেন, কার কাছে যাবেন—এই সিদ্ধান্তে একটু সচেতন হলেই অনেক সময় বড় বিপদ এড়ানো সম্ভব।
শেষ কথা
স্বাতী দেবীর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়। এটি আমাদের গোটা ব্যবস্থার ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। ইউটিউব দেখে অস্ত্রোপচার করার মতো ভয়াবহ ঘটনা যেন আর কখনও না ঘটে, তার জন্য কঠোর আইন, নিয়মিত নজরদারি এবং সর্বোপরি মানুষের সচেতনতা জরুরি। একটি ভুল সিদ্ধান্ত, একটি ভুয়ো চিকিৎসকের হাতে জীবন তুলে দেওয়া—এই এক মুহূর্তের অসতর্কতাই যে পুরো জীবন কেড়ে নিতে পারে, স্বাতীর গল্প সেটাই আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়।


