ধস ও বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত হিমাচল প্রদেশ ও উত্তরাখণ্ড
সম্প্রতি হিমাচল প্রদেশ এবং উত্তরাখণ্ডে মেঘভাঙা বৃষ্টি ও একাধিক ভূমিধসের ফলে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। দুই রাজ্যেরই বিভিন্ন অঞ্চলে রাস্তাঘাট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বহু মানুষ, বিশেষ করে পর্যটক ও তীর্থযাত্রীরা, দীর্ঘ সময় ধরে যানবাহনে আটকে পড়েছেন। বিশেষ করে চণ্ডীগড়-মনালী জাতীয় সড়ক ধসে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কুল্লু ও মনালীর দিকে যাওয়া রাস্তাগুলি কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
পর্যটকদের দীর্ঘ অপেক্ষা, রাত কাটছে গাড়ির ভেতরেই
জাতীয় সড়ক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাজার হাজার পর্যটক ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে গাড়িতে বসে সময় কাটাচ্ছেন। কেউই এগোতে পারছেন না, আবার ফিরে যাওয়ার সুযোগও নেই। অনেকে বাধ্য হয়ে রাত কাটিয়েছেন গাড়িতেই। উত্তরপ্রদেশের এক পর্যটক বলেন,
“জীবনের চেয়ে বড় কিছু নেই, রাস্তা পরিষ্কার হলে না-ই বা মনালী গেলাম।”
এদিকে, পণ্যবাহী ট্রাক চালকরাও দুর্দশায়। এক ব্যবসায়ী জানান,
“বর্ষা শুরু হওয়ার পর থেকে যাতায়াতে প্রতিদিন সমস্যা হচ্ছে, কিন্তু পেটের দায়ে যেতেই হচ্ছে।”
উদ্ধারকাজে তৎপর আইটিবিপি ও এনডিআরএফ
ইন্দো-তিব্বত সীমান্ত পুলিশ (ITBP) এবং জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (NDRF) পরিস্থিতি সামাল দিতে উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে কিন্নৌর-কৈলাস ট্রেক রুট থেকে প্রায় ৪০০ পুণ্যার্থীকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বৃষ্টিপাত ও ধসে ওই অঞ্চলের দুইটি অস্থায়ী সেতু ভেঙে পড়ে, ফলে বহু তীর্থযাত্রী আটকে যান মাঝপথে।
একমুখী বিকল্প রাস্তায় হালকা যান চলাচলের উদ্যোগ
স্থানীয় প্রশাসন আপাতত একটি একমুখী বিকল্প পথ খোলার পরিকল্পনা করছে, যা দিয়ে কেবল হালকা যানবাহন চলাচল করতে পারবে। তবে পূর্ণাঙ্গ রাস্তাঘাট পরিষ্কার করে চালু করতে কিছুটা সময় লাগবে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে।
হিমাচলে ১৯৪ জনের মৃত্যু, ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২ কোটি
হিমাচল প্রদেশের রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্ষা শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত রাজ্যে ১৯৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১.৮৫ কোটি টাকা।
বেশিরভাগ মৃত্যু হয়েছে ভূমিধস, মেঘভাঙা বৃষ্টি ও হড়পা বানজনিত কারণে। পরপর এমন দুর্যোগে পর্যটনশিল্পও গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
উত্তরকাশীতে হড়পা বানে ধ্বংসস্তূপ, নিখোঁজ সেনাকর্মীরাও
উত্তরাখণ্ডের উত্তরকাশী জেলার ধরালী গ্রামে হঠাৎ মেঘভাঙা বৃষ্টিতে সৃষ্টি হয় বিধ্বংসী হড়পা বান। জলের তোড়ে ভেসে গেছে বহু ঘরবাড়ি ও সম্পদ। প্রশাসনের মতে, ৪ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হলেও নিখোঁজের সংখ্যা এখনও নির্দিষ্টভাবে জানা যায়নি।
এছাড়া, হর্ষিল সেনাছাউনির কাছ থেকে ১১ জন সেনাকর্মী নিখোঁজ রয়েছেন বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। উত্তরকাশী জুড়ে লাল সতর্কতা জারি করেছে আবহাওয়া দফতর।
পর্যটন নির্ভর অর্থনীতি সংকটে
হিমাচল ও উত্তরাখণ্ড রাজ্যের অর্থনীতির একটি বড় অংশ নির্ভর করে পর্যটনের উপর। এই ধরনের দুর্যোগ পরিস্থিতি পর্যটকদের ভ্রমণ পরিকল্পনায় বড় ধাক্কা দিচ্ছে। হোটেল ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে স্থানীয় গাইড, গাড়িচালক—সবারই আয় মারাত্মকভাবে কমে গেছে।
করণীয় ও সতর্কতা
এ অবস্থায় পর্যটকদের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে:
- আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে ভ্রমণের পরিকল্পনা করুন।
- স্থানীয় প্রশাসনের দেওয়া নির্দেশিকা মেনে চলুন।
- জরুরি প্রয়োজন না থাকলে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যাওয়া এড়িয়ে চলুন।
- বিপদকালীন কন্টাক্ট নাম্বার ও নিরাপদ আশ্রয়স্থলের তালিকা রাখুন।
উপসংহার
হিমাচল প্রদেশ ও উত্তরাখণ্ডে ক্রমাগত প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের সতর্ক করে দিচ্ছে যে, পাহাড়ি অঞ্চলে পর্যটনের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা নেওয়া জরুরি। পর্যটক, তীর্থযাত্রী, স্থানীয় মানুষ ও প্রশাসন সবাইকে সমন্বয়ের মাধ্যমে এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। জীবনের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই সর্বাগ্রে।


