মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ঘোষণায় ভারতের রফতানি খাতে নেমে এসেছে নজিরবিহীন ঝড়। রাশিয়া থেকে তেল কেনার ‘অপরাধে’ আগামী ২৭ আগস্ট থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে ভারতীয় পণ্যের ওপর ৫০% মার্কিন শুল্ক। মাত্র ১৯ দিনের মধ্যে এই ধাক্কা সামলাতে না পারলে ভারতের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অভূতপূর্ব বাণিজ্যিক আঘাত
ভারত প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৮৭ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি করে। ৫০% শুল্ক কার্যকর হলে বেশিরভাগ ভারতীয় পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না। রফতানিকারকদের দাবি, তারা সর্বোচ্চ ১৫% পর্যন্ত শুল্কবৃদ্ধি সহ্য করতে পারবেন—৫০% বৃদ্ধিতে ব্যবসা কার্যত ধ্বংসের মুখে পড়বে।
বিশ্লেষকরা একবাক্যে বলছেন, এশিয়ায় এর আগে কোনো দেশকে এত চড়া শুল্কের মুখে পড়তে হয়নি। ভারতের এই অবস্থা এখন মার্কিন-ব্রাজিল ‘ঠান্ডা যুদ্ধ’ পরিস্থিতির সমতুল্য।
প্রধান ক্ষতিগ্রস্ত খাত
যদিও ইলেকট্রনিকস ও ফার্মাসিউটিক্যাল খাত আপাতত ছাড় পাচ্ছে, তবু টেক্সটাইল, হীরার গয়না, ও স্বর্ণালঙ্কার শিল্পে প্রভাব পড়বে ভয়াবহভাবে। তিরুপুরের পোশাক কারখানা বা সুরাটের গয়নার কারখানায় হাজার হাজার শ্রমিক চাকরি হারাতে পারেন। কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রি ইতিমধ্যেই সতর্ক করেছে—ভারতের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে।
চীন-রাশিয়া-ভারতের সম্ভাব্য অক্ষ
অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, এই শুল্ক সংকট ভারতের জন্য কৌশলগত জোট পুনর্বিবেচনার সুযোগ। দিল্লি রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে পারে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আসন্ন সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও) সম্মেলন এ প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
দক্ষিণপন্থী চিন্তাবিদ শুভ্রকমল দত্তের মতে, ট্রাম্পের ‘বুলিইং’ নীতি বরং এই তিন দেশের মধ্যে ‘ট্রয়কা’ জোট গঠনের পথ খুলে দিয়েছে।
রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধের সম্ভাবনা
রাশিয়া ভারতের প্রধান ক্রুড অয়েল সরবরাহকারী হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাশ্রয়ের হার অনেক কমেছে—প্রতি ব্যারেলে মাত্র ৩-৪ ডলার। ফলে রাশিয়া থেকে আমদানি কমালে ভারতের অর্থনৈতিক ক্ষতি সীমিত থাকবে। তবে মোদী-পুতিনের সাম্প্রতিক কথোপকথনে ‘বিশেষ সম্পর্ক’ বজায় রাখার বার্তা স্পষ্ট।
আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির আলোচনার ভবিষ্যৎ
শুল্ক ঘোষণার পরও দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা পুরোপুরি থামেনি। এ মাসের শেষ দিকে মার্কিন প্রতিনিধি দল দিল্লি সফর করবে। তবে কৃষি ও ডেয়ারি খাতে ছাড় দেওয়ার প্রশ্নে ভারত কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে। এই খাতগুলোতে আপস রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।
ভারতের সম্ভাব্য পদক্ষেপ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারত নিম্নলিখিত পদক্ষেপ নিতে পারে:
- রফতানিকারকদের প্রণোদনা বৃদ্ধি – সরাসরি ভর্তুকি বা কর ছাড়।
- পাল্টা ট্যারিফ আরোপ – ২০১৯ সালের মতো মার্কিন পণ্যে শুল্ক বসানো।
- বাজার বহুমুখীকরণ – ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার নতুন বাজার খোঁজা।
- কূটনৈতিক আলোচনার জোরদার – দ্রুত চুক্তি সইয়ের জন্য সমঝোতা।
কংগ্রেস নেতা শশী থারুরও পাল্টা শুল্কের পক্ষে মত দিয়েছেন, যা আত্মমর্যাদার প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।


