ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ কতদিন চলবে, আর শেষটা কেমন হবে—এই প্রশ্ন এখন গোটা বিশ্বের মাথায় ঘুরছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump নিজেই জানিয়ে দিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান এক মাসের বেশি সময় ধরেও চলতে পারে। তবে এই সময়ের মধ্যেই যে নিশ্চিত জয় মিলবে, সে কথা স্পষ্ট করে বলেননি তিনি। ফলে যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে বড়সড় অনিশ্চয়তা।
রবিবার রাতে আমেরিকার সময় অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগে আরও সেনার প্রাণহানি ঘটতে পারে। তার ঠিক পরদিন সকালে তিনি ইঙ্গিত দেন, ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান অন্তত চার বা পাঁচ সপ্তাহ পর্যন্ত গড়াতে পারে।
শুনতে হয়তো চার-পাঁচ সপ্তাহ খুব বেশি সময় নয়। কিন্তু যুদ্ধের ক্ষেত্রে একেকটা দিনই অনেক বড়। প্রতিদিন নতুন হামলা, নতুন ক্ষয়ক্ষতি, নতুন উত্তেজনা। তাই এক মাসের বেশি সময় যুদ্ধ চলার সম্ভাবনা মানেই পরিস্থিতি দ্রুত শান্ত হচ্ছে না—এটা পরিষ্কার।
ট্রাম্প আরও বলেন, প্রয়োজনে আমেরিকা দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ চালাতে প্রস্তুত। তবে চার-পাঁচ সপ্তাহ পর তেহরানের বিরুদ্ধে নির্ণায়ক জয় মিলবে কি না, সে বিষয়ে তিনি সরাসরি কিছু বলেননি।
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা Ali Khamenei-এর মৃত্যুর পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। তাঁর অনুগামীরা মরণপণ প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। সামরিক বিশ্লেষকদের অনেকেই বলছেন, এই মনোবল ভাঙা সহজ নয়।
যুদ্ধ শুধু অস্ত্রের লড়াই নয়, এটা মানসিক শক্তিরও পরীক্ষা। যখন একটি দেশের মানুষ মনে করে তারা অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করছে, তখন প্রতিরোধ অনেক বেশি কঠিন হয়ে ওঠে। ইরানের ক্ষেত্রেও সেই চিত্রই দেখা যাচ্ছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে ইজ়রায়েল ও আমেরিকা যৌথভাবে ইরানের উপর বড় আকারের বিমান হামলা চালায়। ইজ়রায়েলের অভিযানের নাম ছিল ‘অপারেশন লায়নস রোর’, আর আমেরিকার অভিযানের নাম ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’।
এই হামলার পর ইরান চুপ করে থাকেনি। তেহরান একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমানহানা চালায় ইজ়রায়েল, কুয়েত, বাহরিন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, সাইপ্রাস, জর্ডন ও সৌদি আরবে।
ভাবুন তো, একটা দেশ নয়—পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে যুদ্ধের আগুন। ফলে এটি আর কেবল দু’দেশের লড়াই নেই, বরং পশ্চিম এশিয়াজুড়ে বড় সংঘাতে রূপ নিয়েছে।
রবিবার রাতে ইরানের হামলায় কুয়েতে তিনজন মার্কিন সেনা নিহত হন। গুরুতর আহত হন আরও পাঁচজন। এর পরদিন বাহরিনে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দফতরেও হামলা চালায় ইরান।
যখন সরাসরি মার্কিন ঘাঁটি টার্গেট হয়, তখন আমেরিকার জন্য বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। কারণ এতে শুধু সামরিক নয়, রাজনৈতিক চাপও বেড়ে যায়। দেশের ভেতরেও প্রশ্ন ওঠে—এই যুদ্ধ কতটা প্রয়োজনীয়, আর এর শেষ কোথায়?
বিভিন্ন সামরিক পর্যবেক্ষক মনে করছেন, আমেরিকা-ইজ়রায়েল যৌথবাহিনীর পক্ষে ইরানকে দ্রুত পরাস্ত করা কঠিন হবে। কারণ ইরান শুধু নিজস্ব ভূখণ্ডেই লড়ছে না, তারা পুরো অঞ্চলে কৌশলগত অবস্থান তৈরি করে রেখেছে।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি, ড্রোন প্রযুক্তি এবং আঞ্চলিক মিত্রদের সমর্থন এই যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করতে পারে। সহজ করে বললে, এটা এমন একটা ম্যাচ যেখানে একপক্ষ ভাবছিল দ্রুত জিতবে, কিন্তু প্রতিপক্ষ শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়ে যাচ্ছে।
এই সংঘাতের প্রভাব শুধু আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। সাইপ্রাসে ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটিতেও হামলার চেষ্টা চালায় ইরান।
এতে বোঝা যায়, ইরান সরাসরি জবাব দিতে চাইছে। তারা দেখাতে চাইছে, আঘাত এলে পাল্টা আঘাত দিতেও তারা প্রস্তুত।
যদি যুদ্ধ চার-পাঁচ সপ্তাহের বেশি গড়ায়, তাহলে কয়েকটি বড় প্রভাব পড়তে পারে।
প্রথমত, জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়বে। তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব পড়বে বিশ্ব অর্থনীতিতে।
দ্বিতীয়ত, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ভেঙে পড়তে পারে। ছোট ছোট দেশগুলোও বড় সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে।
তৃতীয়ত, মানবিক সংকট তৈরি হতে পারে। সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে হয়, অর্থনীতি ভেঙে পড়ে, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে যায়।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলেও তিনি বিরক্ত হবেন না। এই মন্তব্য অনেকের কাছে শক্ত অবস্থানের বার্তা। আবার কেউ কেউ বলছেন, এটি কূটনৈতিক চাপ তৈরির কৌশলও হতে পারে।
কারণ অনেক সময় কঠোর বক্তব্য দিয়ে প্রতিপক্ষকে আলোচনার টেবিলে আনতে চাওয়া হয়। তবে বাস্তবে পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করছে ময়দানের লড়াই এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির উপর।
এই মুহূর্তে স্পষ্ট একটাই—দ্রুত সমাপ্তির কোনো ইঙ্গিত নেই। চার-পাঁচ সপ্তাহের পূর্বাভাস মানেই যুদ্ধ দীর্ঘ হতে পারে। কিন্তু সেই সময় শেষে ফল কী দাঁড়াবে, সেটা এখনই বলা কঠিন।
যুদ্ধের গল্পে আমরা প্রায়ই দেখি একপক্ষ জিতে যায়, আরেকপক্ষ হারে। কিন্তু বাস্তবে যুদ্ধ মানে দু’পক্ষেরই ক্ষতি। প্রাণহানি, অর্থনৈতিক ধাক্কা, রাজনৈতিক অস্থিরতা—সব মিলিয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে।
ইরান-আমেরিকা সংঘাত এখন সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে প্রতিটি দিন নতুন মোড় আনতে পারে। চার-পাঁচ সপ্তাহ পর ইতিহাস কী বলবে—সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।



