নেপালের রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেই এক নাম বারবার উঠে আসছে আলোচনার কেন্দ্রে— কুল মান ঘিসিং। যিনি শুধু একজন বিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞই নন, বরং নেপালবাসীর কাছে এক ‘ত্রাতা’। তাঁর হাত ধরেই দেশ পেয়েছিল বিদ্যুৎ পরিষেবায় বিপ্লব, বন্ধ হয়েছিল দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিং। এবার সেই কুল মানকেই চাইছেন বিক্ষুব্ধ জনগণ, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে।
কে এই কুল মান ঘিসিং?
১৯৭০ সালের ২৫ নভেম্বর নেপালের রামেছাপ জেলায় জন্ম কুল মানের। স্কুলজীবন কেটেছে নেপালেই, তবে উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি আসেন ভারতে। ঝাড়খণ্ডের জামশেদপুর রিজিওনাল ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (RIT) থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে নেপালের পুলচওক ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকেও উচ্চতর শিক্ষা সম্পন্ন করেন।
কুল মান শুধু একজন দক্ষ ইঞ্জিনিয়ারই নন, তিনি ছিলেন নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটি (NEA)-র সফল অধিকর্তা। ২০১৬ থেকে ২০২০ পর্যন্ত প্রথম মেয়াদে এবং ২০২১ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত দ্বিতীয় মেয়াদে তিনি দায়িত্ব সামলান। তাঁর নেতৃত্বেই বিদ্যুৎ খাতে আসে আমূল পরিবর্তন।
লোডশেডিং বন্ধের জনক
নেপালে লোডশেডিং একসময় দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। দিনের পর দিন বিদ্যুৎ না থাকায় সাধারণ মানুষ থেকে ব্যবসা— সবাই ভুগছিল। কুল মান ঘিসিং দায়িত্ব নেওয়ার পরই প্রথম কাজ ছিল এই সমস্যা চিরতরে দূর করা।
✅ বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো
✅ বিদ্যুৎ বণ্টন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা
✅ বিদ্যুৎ চুরি বন্ধ করা
✅ আধুনিক বিলিং সিস্টেম চালু করা
✅ বিদ্যুৎ আমদানি ও রপ্তানির নতুন নীতি প্রণয়ন
তাঁর উদ্যোগেই কয়েক দশকের পুরোনো বিদ্যুৎ সংকট থেকে মুক্তি পায় নেপাল। দেশবাসী প্রথমবারের মতো নিয়মিত বিদ্যুৎ সুবিধা ভোগ করতে শুরু করে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরব এক যোদ্ধা
কুল মান শুধু প্রযুক্তিগত দিক থেকে নয়, প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও ছিলেন এক ব্যতিক্রমী নেতা। নেপালের সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবসময় কঠোর অবস্থান নিতেন। এই সততা ও সাহসই তাঁকে আলাদা করে তুলেছিল।
এ কারণেই শুধু যুবসমাজ নয়, বরং নেপালের সব স্তরের মানুষ তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা ও আস্থা রাখেন। জনগণের কাছে তিনি শুধু একজন ইঞ্জিনিয়ার নন, বরং বিশ্বাসযোগ্য ও স্বচ্ছ নেতৃত্বের প্রতীক।
সরকারের সঙ্গে সংঘাত ও অপসারণ
২০২৫ সালের মার্চে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির সরকার তাঁকে পদ থেকে সরিয়ে দেয়। অভিযোগ আনা হয়—সময়মতো রিপোর্ট জমা দিচ্ছেন না,ভারতের সঙ্গে বিদ্যুৎ চুক্তি নিয়ে অনুমোদন নেননি,সরকারি নির্দেশিকা অমান্য করেছেন।
তবে এই অভিযোগগুলোকে নেপালের সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবেই দেখেছেন। বরং অপসারণের পর তাঁর জনপ্রিয়তা আরও বেড়েছে। জনগণ মনে করেন, বিদ্যুৎ পরিষেবা নিয়ে নাজেহাল নেপালবাসীর জন্য কুল মানই ছিলেন একমাত্র আশার আলো।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান পদে নাম কেন উঠল কুল মানের?
বর্তমানে নেপাল উত্তাল রাজনৈতিক বিক্ষোভে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে প্রথমে আলোচনায় ছিলেন সুশীলা কারকি ও বলেন্দ্র শাহ। কিন্তু জনগণের মধ্যে হঠাৎই কুল মানের নাম উঠে আসতে শুরু করেছে।
কারণ—তিনি রাজনৈতিক দলের বাইরে থেকে এসেছেন, তাই তুলনামূলক নিরপেক্ষ।দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান জনগণের আস্থা জুগিয়েছে।বিদ্যুৎ বিপ্লবের অভিজ্ঞতা তাঁকে সফল প্রশাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।যুবসমাজের কাছে তিনি এক অনুপ্রেরণা।ফলে সুশীলা ও বলেন্দ্রকে ছাপিয়ে কুল মান এখন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন।
নেপালের জনগণের প্রত্যাশা
আজ নেপালের মানুষ চায় একজন সৎ, নিরপেক্ষ এবং উন্নয়নমুখী নেতা। কুল মান ঘিসিংয়ের ওপর তাঁদের আস্থা অটল। যে মানুষ বিদ্যুৎ সংকটের মতো জটিল সমস্যার সমাধান করতে পেরেছেন, তিনি দেশের রাজনৈতিক অচলাবস্থা দূর করতেও সক্ষম হবেন— এই বিশ্বাসই ছড়িয়ে পড়ছে আন্দোলনকারীদের মধ্যে।


