পৃথিবীর ইতিহাসে সূর্যগ্রহণ নতুন নয়। তবে ২০২৭ সালের ২ অগাস্ট যে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ ঘটতে চলেছে, সেটিকে বৈজ্ঞানিক মহলে এবং জ্যোতির্বিদদের কাছে চিহ্নিত করা হচ্ছে “শতাব্দীর সবচেয়ে লম্বা সময়ের সূর্যগ্রহণ” হিসেবে। এমন একটি ঘটনা, যেখানে সূর্য সম্পূর্ণ ৬ মিনিট ২২ সেকেন্ড সময় ধরে অদৃশ্য থাকবে, অকাল অন্ধকারে ডুবে যাবে পৃথিবীর একাংশ।
পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ কী এবং কেন এটি এত গুরুত্বপূর্ণ
পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ ঘটে যখন চাঁদ সূর্য ও পৃথিবীর মাঝখানে এসে দাঁড়ায়, এবং সম্পূর্ণভাবে সূর্যকে ঢেকে ফেলে। এই সময় কয়েক মিনিটের জন্য সূর্যের আলো পৃথিবীতে পৌঁছাতে পারে না, ফলে দিনের বেলায় হঠাৎ সন্ধ্যা নেমে আসে।
২০২৭ সালের এই সূর্যগ্রহণ এত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এর ব্যাপ্তি হবে শতাব্দীর মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ—৬ মিনিট ২২ সেকেন্ড! সাধারণত পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের সময়কাল ২-৪ মিনিটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। তাই এই ঘটনাটি বৈজ্ঞানিক মহলে অসামান্য আগ্রহের জন্ম দিয়েছে।
কবে ঘটবে এই দীর্ঘতম সূর্যগ্রহণ?
আমাদের দিনপঞ্জিতে চিহ্নিত করে রাখার মতো তারিখ:
২ অগাস্ট, ২০২৭ (2 August, 2027)।
এই দিনটিতে পৃথিবীর নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চল আলো থেকে অন্ধকারে ডুবে যাবে, আবার চাঁদের ছায়া কেটে গেলে ফের সূর্য উঠবে ঝলকানি নিয়ে।
সর্বোচ্চ অন্ধকার কতক্ষণ থাকবে?
যদিও সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে ১১টি দেশ থেকে, তবে শুধুমাত্র মিশরের লাক্সার (Luxor, Egypt) শহর থেকে দেখা যাবে এই পূর্ণগ্রাসের সর্বোচ্চ সময়কাল—৬ মিনিট ২২ সেকেন্ড। অন্য দেশগুলোতে কিছু কম সময়ের জন্য পূর্ণগ্রাস দৃশ্যমান থাকবে।
এটি সম্ভব হচ্ছে কারণ ওই সময় চাঁদ পৃথিবীর খুব কাছাকাছি অবস্থানে থাকবে, ফলে চাঁদের ছায়া বৃহৎ পরিসরে পৃথিবীকে ঢেকে ফেলবে।
যে দেশগুলো থেকে দেখা যাবে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ
এই বিরল সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে বিশ্বের নিম্নোক্ত ১১টি দেশ থেকে:
- মিশর
- স্পেন
- মরক্কো
- জিব্রাল্টার
- তিউনিসিয়া
- আলজেরিয়া
- সুদান
- লিবিয়া
- ইয়েমেন
- ওমান
- সৌদি আরব
- সোমালিয়া
এইসব দেশের অধিবাসীরা সৌভাগ্যবান, কারণ তারা সরাসরি চোখে দেখতে পারবেন এই মহাজাগতিক বিস্ময়। বাকিরা চাইলে পর্যটক হয়ে এই দেশগুলোর কোনো একটিতে গিয়ে প্রত্যক্ষ করতে পারেন সূর্যগ্রহণের সৌন্দর্য।
ভারত থেকে কি দেখা যাবে এই সূর্যগ্রহণ?
দুঃখজনক হলেও সত্য, ভারতবাসীরা এই পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ প্রত্যক্ষ করতে পারবেন না। যদিও ভারত থেকে আংশিক সূর্যগ্রহণ দেখা যেতে পারে, তবে তা পূর্ণগ্রাস হবে না। তাই যারা এই দৃশ্য চর্মচক্ষে দেখতে চান, তাদেরকে ভ্রমণের পরিকল্পনা করতে হবে উপরে উল্লিখিত দেশগুলোর মধ্যে কোনও একটিতে।
কেন এই সূর্যগ্রহণ এত দীর্ঘস্থায়ী?
এই সূর্যগ্রহণ এত দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার মূল কারণ হলো:
- চাঁদের পৃথিবীর কাছাকাছি অবস্থান – চাঁদ যখন পৃথিবীর সবচেয়ে নিকটবর্তী বিন্দুতে থাকে (perigee), তখন তার আকার আকাশে তুলনামূলক বড় দেখায়, ফলে সূর্যকে পুরোপুরি ও দীর্ঘ সময়ের জন্য ঢেকে ফেলতে পারে।
- সূর্য, চাঁদ ও পৃথিবীর অক্ষরেখায় নিখুঁত সংযোজন – এর ফলে ছায়ার বিস্তার এবং স্থায়িত্ব বৃদ্ধি পায়।
- প্রকৃত সময়কাল (Duration of Totality) – যা কিনা জ্যোতির্বিদ্যাগতভাবে ৬ মিনিট ২২ সেকেন্ড ধরে সূর্য পুরোপুরি অদৃশ্য থাকবে।
বিজ্ঞান ও গবেষণার দৃষ্টিতে এই সূর্যগ্রহণ
বিজ্ঞানীদের কাছে এই দীর্ঘ সূর্যগ্রহণ একটি অভূতপূর্ব গবেষণার সুযোগ। এই সময়:
- সূর্যের করোনা (Corona)—অর্থাৎ সূর্যের বাইরের আবরণ—পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।
- চৌম্বক ক্ষেত্র ও সৌর বায়ুর প্রভাব নিয়ে গবেষণা চালানো হবে।
- মহাকাশীয় আবহাওয়া পরিবর্তনের উপর সূর্যগ্রহণের প্রভাব বিশ্লেষণ করা যাবে।
পর্যটন ও সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণ: কোথায় যাবেন?
যদি আপনি একজন গভীর আগ্রহী মহাকাশপ্রেমী বা পর্যবেক্ষক হন, তবে এই সূর্যগ্রহণ দেখার সেরা গন্তব্য হতে পারে:
- মিশরের লাক্সার শহর – সর্বোচ্চ সময় ধরে পূর্ণগ্রাস দেখা যাবে এখান থেকে।
- মরক্কো ও স্পেন – ভালো দৃশ্যমানতা ও পর্যটনের সুযোগ রয়েছে।
ভ্রমণের আগে আবহাওয়া, নিরাপত্তা ও স্থানীয় নির্দেশিকা সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
সতর্কতা: সূর্যগ্রহণ দেখার সময় কী করবেন না
- নগ্ন চোখে সূর্য দেখবেন না – পূর্ণগ্রাস শুরুর আগে ও পরে সূর্যের তীব্র আলো চোখের ক্ষতি করতে পারে।
- Solar Viewing Glasses ব্যবহার করুন – শুধুমাত্র বৈজ্ঞানিক মান্যতাপ্রাপ্ত চশমা ব্যবহার করুন।
- সরাসরি ক্যামেরায় না দেখুন – বিশেষ ফিল্টার ছাড়া সূর্যের ছবি তুললে ক্যামেরা লেন্স নষ্ট হতে পারে।
পরবর্তী লম্বা সূর্যগ্রহণ কবে?
এই দীর্ঘতম সূর্যগ্রহণের পর, ২১১৪ সালের আগে আর কোনো সূর্যগ্রহণ এত দীর্ঘ সময় ধরে হবে না। অর্থাৎ, যারা ২০২৭ সালে এই দৃশ্য দেখবেন, তারা একটি অতীব দুর্লভ ও স্মরণীয় মুহূর্তের সাক্ষী হতে চলেছেন।
একবারের জন্য একটি যুগান্তকারী অভিজ্ঞতা
২০২৭ সালের ২ অগাস্টের পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ একটি অভূতপূর্ব মহাজাগতিক দৃশ্য যা অনেকেই হয়তো জীবনে একবারই দেখার সুযোগ পাবেন। যারা প্রকৃতি ও মহাকাশের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন, তাদের জন্য এটি এক অনন্য সুযোগ।
এই অভিজ্ঞতা হতে পারে আপনার জীবনের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী এবং বিস্ময়কর মুহূর্ত—যেখানে সকালবেলা ঘোর অন্ধকারে আপনি দেখতে পাবেন এক স্বর্গীয় সূর্যাস্তের খেলা।


