সৌদি আরবের রাজনীতিতে মোহাম্মদ বিন সালমান, সংক্ষেপে এমবিএস, বর্তমানে সবচেয়ে প্রভাবশালী ও বিতর্কিত এক নাম। অল্প বয়সেই ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসা, রাজনৈতিক কৌশল, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, আন্তর্জাতিক নীতি ও সংস্কারমূলক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তিনি সৌদি রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছেন। এই প্রবন্ধে আমরা দেখব, কীভাবে বাদশাহ সালমানের ছেলে এমবিএস সৌদি আরবের প্রকৃত ক্ষমতাধর হয়ে ওঠেন এবং কীভাবে তার সিদ্ধান্তগুলো দেশ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার ঝড় তোলে।
২০১৫ সালে বাদশাহ আব্দুল্লাহর মৃত্যুর পর সৌদি সিংহাসনে বসেন সালমান বিন আবদুল আজিজ। শুরুতে মুকরিন বিন আবদুল আজিজকে ক্রাউন প্রিন্স ঘোষণা করা হলেও মাত্র তিন মাসের মধ্যেই তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তার জায়গায় নিয়োগ পান বাদশাহ সালমানের ভাইপো মোহাম্মদ বিন নায়েফ।
এই সময়ই এমবিএস, তখন মাত্র ২৯ বছর বয়সে, ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্স ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত হন। রাজনীতিতে নবীন হলেও, ক্ষমতা দখলের পরিকল্পনা তখন থেকেই শুরু করেছিলেন তিনি।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী হওয়ার পর এমবিএস দ্রুতই বাদশাহের ‘গেটকিপার’ হয়ে ওঠেন। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ডেভিড বি. ওটাওয়ে তার বইয়ে উল্লেখ করেছেন যে, এমবিএস তার বাবাকে পরিবার ও ঘনিষ্ঠদের থেকে দূরে সরিয়ে দেন। এমনকি তার মায়ের সঙ্গেও দেখা করতে বাদশাহকে বাধা দেওয়া হয়।
এমবিএসের এই পদক্ষেপ তাকে রাজপরিবারে একাধিপত্য বিস্তারের সুযোগ করে দেয়। একই সঙ্গে তিনি রাজপ্রাসাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেন।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে এমবিএসের অন্যতম সাহসী পদক্ষেপ ছিল ২০১৫ সালে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান। সৌদি বিমানবাহিনীর এই হামলাকে শুরুতে দেশবাসী ইরানের প্রভাব মোকাবিলার সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে প্রশংসা করলেও, অল্প সময়ের মধ্যেই এই যুদ্ধ সৌদি আরবের জন্য কৌশলগত ব্যর্থতায় পরিণত হয়।
আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচিত এই যুদ্ধ এমবিএসের পররাষ্ট্রনীতির ওপর প্রশ্ন তুলে দেয়, যা তাকে আরও দৃঢ়ভাবে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিতে প্ররোচিত করে।
২০১৭ সালে বাদশাহ সালমান নাটকীয়ভাবে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন নায়েফকে পদচ্যুত করে এমবিএসকে ক্রাউন প্রিন্স ঘোষণা করেন। এক প্রকার গৃহবন্দি করে নায়েফের পদত্যাগ আদায় করা হয়।
রয়্যাল কাউন্সিলের ৩৪ জন সদস্যের মধ্যে ৩১ জন এই সিদ্ধান্তের পক্ষে ভোট দেন। এর পর এমবিএস আনুষ্ঠানিকভাবে সৌদি আরবের ক্ষমতার দ্বিতীয় শীর্ষ আসনে বসেন, যা তার ক্ষমতা আরও সুদৃঢ় করে।
এমবিএসের ক্ষমতা দখলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে। তিনি দুর্নীতির অভিযোগে ৩৮০ জন প্রিন্স, ব্যবসায়ী ও শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তাকে আটক করেন। এদের মধ্যে ১১ জন প্রিন্সও ছিলেন।
রিয়াদের পাঁচ তারকা রিৎজ-কার্লটন হোটেলকে সাময়িক কারাগার বানিয়ে রাখা হয় গ্রেফতারকৃতদের। মুক্তির শর্ত ছিল অবৈধ সম্পদ সরকারের কাছে ফেরত দেওয়া। এই অভিযানের মাধ্যমে এমবিএস রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের দুর্বল করে তার ক্ষমতার ভিত্তি আরও মজবুত করেন।
একই সময়ে লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ আল-হারিরিকে সৌদি আরবে সফরকালে আটক করার অভিযোগ ওঠে। তাকে টেলিভিশনে দাঁড়িয়ে পদত্যাগ ঘোষণা করতে বাধ্য করা হয় বলে জানা যায়।
যদিও কয়েকদিন পর হারিরি দেশে ফিরে এসে পদত্যাগ প্রত্যাহার করেন, এই ঘটনা সৌদি রাজনীতিতে এমবিএসের অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতার দৃষ্টান্ত হিসেবে ইতিহাসে স্থান পায়।
এমবিএসের নেতৃত্বে সৌদি আরবে কিছু ঐতিহাসিক সামাজিক সংস্কার হয়। ২০১৮ সালে নারীদের গাড়ি চালানোর অধিকার দেওয়া হয় এবং প্রকাশ্যে ‘আবায়া’ পরার বাধ্যবাধকতা শিথিল করা হয়।
যদিও সমালোচকরা বলেন, এসব সংস্কারের পেছনে আসল উদ্দেশ্য ছিল দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, এমবিএস এটিকে সৌদি যুবসমাজকে আধুনিকায়নের পথে আনার কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেন।
তুরস্কের ইস্তানবুলে সৌদি কনস্যুলেটে সাংবাদিক জামাল খাসোগজির হত্যাকাণ্ড এমবিএসের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিতে বড় ধাক্কা আনে। যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএসহ একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা এই হত্যাকাণ্ডে এমবিএসের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা খুঁজে পায়।
যদিও তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেন, পরে সৌদি আদালত পাঁচজনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। এই ঘটনার পর থেকে আন্তর্জাতিক মহলে এমবিএসের ভাবমূর্তি বিতর্কিত হয়ে ওঠে।
এমবিএসের বিলাসবহুল জীবনধারা বিশ্বজুড়ে আলোচনার বিষয়। তিনি ৫০ কোটি ডলার দিয়ে বিলাসবহুল ইয়ট এবং ৪৫ কোটি ডলার দিয়ে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির বিখ্যাত চিত্রকর্ম কেনেন।
এই বিলাসিতা সমালোচিত হলেও এমবিএস সৌদি আরবের আধুনিকায়ন, ‘ভিশন ২০৩০’ পরিকল্পনা এবং বিনিয়োগ নীতির মাধ্যমে নিজেকে সংস্কারক নেতা হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।


