বিশ্ব ফুটবল মানেই শুধু মাঠের লড়াই নয়। কখনও কখনও রাজনীতি, কূটনীতি আর তারকাখ্যাতি মিলেমিশে এমন এক গল্প তৈরি করে, যা মাঠের গোলের চেয়েও বেশি আলোচনার জন্ম দেয়। ঠিক তেমনই এক সম্ভাব্য ঐতিহাসিক মুহূর্ত নিয়ে এখন সরগরম আন্তর্জাতিক ক্রীড়ামহল। প্রশ্ন একটাই—লিওনেল মেসি কি সত্যিই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর সঙ্গে হোয়াইট হাউসে সাক্ষাৎ করতে চলেছেন?
এই খবর ঘিরে ফুটবলপ্রেমীদের কৌতূহলের শেষ নেই। কারণ, এর আগে একই জায়গায় দেখা গিয়েছিল আরেক মহাতারকাকে—ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোকে। সেই রেশ কাটতে না কাটতেই নতুন করে আলোচনায় উঠে এলেন আর্জেন্টিনার ফুটবল জাদুকর।
সম্প্রতি মার্কিন রাজনৈতিক অঙ্গনে ফুটবলের উপস্থিতি বেশ চোখে পড়ার মতো। নভেম্বর মাসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমন্ত্রণে হোয়াইট হাউসে গিয়েছিলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। সেই সাক্ষাৎ বিশ্বজুড়ে তৈরি করেছিল নানা আলোচনা। কেউ দেখেছিল কূটনৈতিক সৌজন্য, কেউ আবার দেখেছিল তারকাখ্যাতির প্রভাব।
ঠিক সেই সময়েই গুঞ্জন শুরু হয়, এবার হয়তো লিওনেল মেসির পালা। সব কিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী চললে, খুব শিগগিরই মেসিকে দেখা যেতে পারে হোয়াইট হাউসের ঐতিহাসিক করিডরে।
সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যাচ্ছে, সম্ভাব্য সাক্ষাতের সময় হিসেবে ধরা হচ্ছে মার্চের প্রথম সপ্তাহ। এমএলএসে ডিসি ইউনাইটেড-এর বিপক্ষে ম্যাচের দু’দিন পরই এই বিশেষ আয়োজন হতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলেছে।
এই সফরের মূল কারণ একেবারেই ফুটবলকেন্দ্রিক। এমএলএস কাপ জয়ের উদযাপন উপলক্ষে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রিত হতে পারেন ইন্টার মায়ামি দলের খেলোয়াড়রা। সেই দলের নেতৃত্বেই থাকবেন মেসি। যদি সত্যিই এই সফর হয়, তবে এটি হবে লিওনেল মেসির জীবনে প্রথম হোয়াইট হাউস সফর।
গত বছরের শেষটা ইন্টার মায়ামির জন্য ছিল স্বপ্নের মতো। ফাইনালে ভ্যানকুভার হোয়াইটক্যাপস-কে ৩–১ গোলে হারিয়ে ক্লাবটি প্রথমবারের মতো এমএলএস কাপ জয়ের স্বাদ পায়। এই জয়ের নেপথ্যে মেসির অবদান নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। মাঠে যেমন তিনি নেতা, মাঠের বাইরেও তেমনই দলের মুখ।
এমন সাফল্যের পর হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ পাওয়া আমেরিকান ক্রীড়াসংস্কৃতিতে এক ধরনের সম্মানের প্রতীক। অনেকের কাছেই এটা জাতীয় স্বীকৃতির মতো।
এই সম্ভাব্য সাক্ষাৎ নিয়ে মেসির পক্ষ থেকে এখনো সরাসরি কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁর এক এজেন্টকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলেও তিনি বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন। তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যম মায়ামি হেরাল্ড জানিয়েছে, দলের প্রায় সবাই একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে উপস্থিত থাকতে পারেন বলে আশা করা হচ্ছে।
এই নীরবতাই যেন আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ফুটবলপ্রেমীরা ভাবছেন, বড় কোনো ঘোষণা আসছে কি না, নাকি সবটাই থাকবে সৌজন্য সাক্ষাতের মধ্যেই।
এই প্রসঙ্গে আরেকটি ঘটনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন লিওনেল মেসিকে আমেরিকার সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ‘মেডেল অফ ফ্রিডম’ গ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। এটি ছিল মেসির আন্তর্জাতিক প্রভাবের স্বীকৃতি।
কিন্তু ব্যস্ত সূচির কারণে সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারেননি আর্জেন্টাইন তারকা। ফলে হোয়াইট হাউসে যাওয়ার সেই সুযোগ তখন হাতছাড়া হয়। এবার ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে, সেটি অনেকটাই সেই অপূর্ণতার জায়গা পূরণ করতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।
ইন্টার মায়ামির সঙ্গে হোয়াইট হাউসের সম্পর্ক অবশ্য একেবারে নতুন নয়। ২০১১ সালে এলএ গ্যালাক্সির হয়ে বড় সাফল্যের পর ক্লাবটির সহ-মালিক ডেভিড বেকহ্যাম হোয়াইট হাউসে গিয়েছিলেন। তখনো সেটি ছিল ফুটবল ও মার্কিন সংস্কৃতির মেলবন্ধনের এক স্মরণীয় মুহূর্ত।
আজ সেই একই ক্লাব, ভিন্ন রূপে, ভিন্ন তারকাকে সামনে রেখে আবার ইতিহাসের দরজায় কড়া নাড়ছে।
মেসি-ট্রাম্প সাক্ষাৎ যদি হয়, তাহলে তা শুধু একটি ছবি বা সংক্ষিপ্ত করমর্দনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি হবে রাজনীতি ও ক্রীড়াজগতের এক বড় প্রতীকী মিলন। কেউ এটিকে দেখবেন সফট পাওয়ার হিসেবে, কেউ দেখবেন তারকাখ্যাতির সামাজিক প্রভাব হিসেবে।
মেসি নিজে রাজনীতি থেকে বরাবরই দূরে থেকেছেন। তাঁর পরিচয় ফুটবলেই সীমাবদ্ধ। তাই এই সাক্ষাৎ হলে সেটিকে কূটনৈতিক বার্তার চেয়ে ক্রীড়াসাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবেই দেখার প্রবণতা বেশি থাকবে।
সব জল্পনা, সব অনুমান শেষ পর্যন্ত নির্ভর করছে একটি বিষয়ের ওপর—এই সাক্ষাৎ আদৌ হবে কি না। যদি হয়, তাহলে লিওনেল মেসির ক্যারিয়ারে এটি যোগ হবে এক নতুন অধ্যায় হিসেবে। মাঠের বাইরেও যে তিনি কতটা প্রভাবশালী, তার আরেকটি প্রমাণ মিলবে সেদিন।
এখন ফুটবলবিশ্ব তাকিয়ে আছে হোয়াইট হাউসের দিকেই। দেখা যাক, ইতিহাসের পাতায় নতুন করে লেখা হয় কি না মেসি আর ট্রাম্পের সেই বহুপ্রতীক্ষিত সাক্ষাতের গল্প।



