নেপালে ফের একবার রাজনৈতিক অস্থিরতা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। দীর্ঘ আন্দোলন আর বিক্ষোভের পর ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন বামপন্থী নেতা কেপি শর্মা ওলি। সেনার হাতে দেশের শাসনভার আসতেই সামনে এসেছে রাজতন্ত্র ফেরার সম্ভাবনা। অন্যদিকে, তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘জেন জি’ আন্দোলন এবার অন্তর্বর্তী নেতা হিসেবে বেছে নিয়েছে প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি সুশীলা কারকিকে। প্রশ্ন একটাই—কোন পথে এগোবে নেপাল? গণতন্ত্র নাকি রাজতন্ত্র?
‘জেন জি’ আন্দোলন: পরিবর্তনের ঝড়
নেপালের তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে শুরু হওয়া ‘জেন জি’ আন্দোলন ধীরে ধীরে গণআন্দোলনের রূপ নেয়। শুরু থেকেই আন্দোলনকারীরা স্লোগান তুলেছিলেন—“রাজা আউনপার্চা”, অর্থাৎ “রাজা ফিরে আসবেই”। হাজার হাজার মানুষ রাজতন্ত্র যুগের পতাকা হাতে রাস্তায় নেমেছিলেন।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল দুর্নীতি ও স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। তাই রাজতন্ত্র ফেরানোর দাবি বাস্তবসম্মত নয় বরং গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার জন্য একধাপ পিছিয়ে যাওয়া বলেই মনে করছেন অনেকে।
২০০১ সালের রাজপ্রাসাদ হত্যাকাণ্ড ও রাজতন্ত্রের পতন
নেপালের রাজতন্ত্র পতনের ইতিহাস রক্তাক্ত।
২০০১ সালের ১ জুনের রাত—এক ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডে কেঁপে ওঠে গোটা বিশ্ব। নেপালের রাজা বীরেন্দ্র, রানি, তাদের সন্তানসহ প্রায় পুরো রাজপরিবার গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে মারা যান। সরকারি তথ্যে বলা হয়, যুবরাজ দীপেন্দ্রই এ হত্যাকাণ্ড ঘটান। যদিও রহস্য আজও অমীমাংসিত।
এই ঘটনার পর সিংহাসনে বসেন দীপেন্দ্রর কাকা, রাজা জ্ঞানেন্দ্র। কিন্তু জনগণের ক্ষোভ আর আন্দোলনের মুখে শেষ পর্যন্ত ২০০৮ সালে পতন হয় ২৪০ বছরের পুরনো শাহ রাজবংশের। নেপাল আনুষ্ঠানিকভাবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়।
গণতন্ত্রের পথেও অস্থিরতা
রাজতন্ত্রের অবসান হলেও রাজনৈতিক স্থিতি আসেনি নেপালে। ক্ষমতার পালাবদল, দুর্নীতি ও দলীয় কোন্দলে বারবার অস্থির হয়ে উঠেছে দেশ। একসময় ক্ষমতায় আসেন মাওবাদী নেতা প্রচণ্ড। পরবর্তীতে বামপন্থী নেতা কেপি শর্মা ওলি দায়িত্ব নিলেও জনগণের আস্থা অর্জন করতে ব্যর্থ হন। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি আর ক্ষমতার অপব্যবহারে সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। এর ফলেই ‘জেন জি’ আন্দোলনের জন্ম এবং অবশেষে ওলির পতন।
সেনার বার্তায় রাজতন্ত্রের ইঙ্গিত
দেশের রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার মাঝে সেনাবাহিনী সামনে আসে। নেপালের সেনাপ্রধান অশোক রাজ সিদগেল জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে জানালেন, আপাতত দেশের শান্তি-শৃঙ্খলার দায়িত্ব নিচ্ছে সেনা। তবে তাঁর বক্তব্য এবং মঞ্চসজ্জা ঘিরে তৈরি হয়েছে জল্পনা। ভাষণের সময় তাঁর পিছনে ছিল নেপালের জাতীয় পতাকা এবং প্রথম রাজা পৃথ্বীনারায়ণ শাহের প্রতিকৃতি। অনেকের মতে, এটি নীরব বার্তা—রাজতন্ত্র ফেরার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
অন্তর্বর্তী নেতা সুশীলা কারকি: গণতন্ত্রের নতুন আশা?
অন্যদিকে, তরুণ প্রজন্মের আন্দোলনের জোরে অন্তর্বর্তী নেতা হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি সুশীলা কারকিকে। তিনি কি সত্যিই অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হবেন? নাকি সেনার অনুমতি ছাড়া তাঁর নেতৃত্ব শুরুই হবে না? এই প্রশ্ন ঘিরেই এখন বিতর্ক। সেনার নীরব সমর্থন না পেলে গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব টিকিয়ে রাখা কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়েই শঙ্কা বাড়ছে।
নেপালের ভবিষ্যৎ কোন পথে?
আজকের নেপাল এক সঙ্কটময় মোড়ে দাঁড়িয়ে।
- তরুণ প্রজন্ম গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার দাবিতে সোচ্চার।
- সেনা বাহিনী দেশের রাশ হাতে নিয়েছে, এবং বারবার রাজতন্ত্রের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
- দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারে ক্ষুব্ধ জনগণ পরিবর্তনের অপেক্ষায়।
প্রশ্ন হচ্ছে—রাজতন্ত্র ফিরে আসবে নাকি গণতন্ত্রের ভিত আরও মজবুত হবে?


