নেপালে তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে শুরু হওয়া বিক্ষোভ ভয়াবহ সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিষিদ্ধ করার সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সৃষ্ট আন্দোলনে অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছে এবং শতাধিক আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাজধানী কাঠমান্ডুসহ বিভিন্ন এলাকায় কারফিউ জারি করা হয়েছে। মোতায়েন করা হয়েছে সেনাবাহিনীও।
ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইন্সটাগ্রামের মতো ২৬টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধ করে দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তই নেপালে তরুণ সমাজকে রাস্তায় নামিয়েছে।
এই তরুণ প্রজন্মকে “জেন জি” নামে ডাকা হয়। তারা বিক্ষোভের মূল নেতৃত্বে থাকায় এ আন্দোলন এখন “জেনজি আন্দোলন” হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
বিক্ষোভকারীরা নিউ বানেশ্বরের ফেডারেল পার্লামেন্ট কমপ্লেক্সে হামলা চালায়। এ সময় সেখানে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সোমবার বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত ওই এলাকায় পরিস্থিতি অশান্ত ছিল।
সংসদ ভবনের ভেতরে প্রবেশের পর নিরাপত্তা বাহিনী বলপ্রয়োগ করলে সংঘর্ষ আরও তীব্র হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানায়, বিক্ষোভকারীরা যখন নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশ করে এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, তখনই প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করা হয়। এতে অন্তত ১৩ জন নিহত হন।
সিভিল সার্ভিস হাসপাতালের মেডিকেল ডিরেক্টর দীপক পাউডেল জানিয়েছেন, শুধুমাত্র তাদের হাসপাতালে একশরও বেশি আহতকে ভর্তি করা হয়েছে। অনেকেই রাবার বুলেটের আঘাতে গুরুতর আহত হয়েছেন।
যোগাযোগমন্ত্রী ও সরকারের মুখপাত্র পৃথ্বী সুব্বা গুরুং হতাহতের ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, “সরকার কিছু একটা করবে।” তবে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ কী হবে তা এখনো স্পষ্ট করেননি।
অন্যদিকে, পুলিশের মুখপাত্র শেখর খানাল জানিয়েছেন, আহতদের সংখ্যা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ চলছে। আহতদের মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যও রয়েছেন।
সংঘর্ষের পরপরই কাঠমান্ডুর সংসদ ভবনের আশেপাশে কারফিউ জারি করা হয়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে শহরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ এলাকাতেও কারফিউ কার্যকর করা হয়।
কারফিউ ঘোষণার কিছুক্ষণের মধ্যেই সেনাবাহিনীকে রাস্তায় নামানো হয়। নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র সহকারী লেফটেন্যান্ট জেনারেল রাজারাম বাসনেত জানান, জেলা নিরাপত্তা কমিটির সুপারিশ এবং আইন-২০২৮ এর বিধান অনুসারে সেনা মোতায়েন করা হয়েছে।
বিক্ষোভকারীরা সংসদ ভবনে প্রবেশ করায় সোমবার বিকেলের নির্ধারিত জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করে দেওয়া হয়। নতুন করে অধিবেশন বসবে বুধবার। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ সিদ্ধান্ত বর্তমান উত্তেজনা আরও ঘনীভূত করতে পারে।
কাঠমান্ডুর সিংহ দরবারের কাছে মাইতিঘর থেকে বিক্ষোভকারীরা যখন সংসদ ভবনের দিকে অগ্রসর হয়, তখনই পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ বাঁধে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পুলিশের টিয়ারশেল, রাবার বুলেট এবং লাঠিচার্জে রাস্তাজুড়ে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। শহরের অধিকাংশ এলাকা এখন কার্যত সেনা ও পুলিশের নিয়ন্ত্রণে।
নেপালে জেনজিদের নেতৃত্বে এই আন্দোলন শুধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রতিবাদেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি তরুণ প্রজন্মের দীর্ঘদিনের অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ।
রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সরকারের কঠোর পদক্ষেপ দেশটিকে আরও অনিশ্চিত পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।


