নেপাল এখন উত্তাল! রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে ছাত্র-যুব বিদ্রোহ। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, এক্স-সহ ২৬টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধের সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে রাজপথে নেমে এসেছে হাজার হাজার তরুণ-তরুণী। বিক্ষোভ দমন করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন কমপক্ষে ১৯ জন। আহত হয়েছেন ২৫০ জনের বেশি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখক পদত্যাগ করেছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে সেনা, র্যাফ এবং অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
নেপালে বিক্ষোভের সূত্রপাত
২০২৫ সালের ৪ অগস্ট থেকে নেপাল সরকার ২৬টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। সরকারের নির্দেশ ছিল, ২৮ জুলাইয়ের মধ্যে ফেসবুক, এক্স, হোয়াটসঅ্যাপসহ সব প্ল্যাটফর্মকে সরকারি রেজিস্ট্রেশনে নাম অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কিন্তু অধিকাংশ কোম্পানি নির্দেশ মানেনি। ফলে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নেয়।
এই সিদ্ধান্তের পর থেকেই উত্তেজনা বাড়তে থাকে। তরুণ প্রজন্ম এবং ছাত্র সংগঠনগুলো সরকারবিরোধী স্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ শুরু করে। সোমবার সকালে কাঠমান্ডুর বাণেশ্বর এলাকা থেকে আন্দোলনের সূচনা হয়, যা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
পুলিশের গুলি, লাঠিচার্জ এবং নিহতের সংখ্যা
প্রথমে পুলিশ ভিড় নিয়ন্ত্রণে রাখতে শূন্যে গুলি ছোঁড়ার দাবি করলেও বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, পুলিশ সরাসরি তাঁদের লক্ষ্য করেই গুলি চালিয়েছে। কারও মাথায়, কারও হাতে, আবার কারও বুকে গুলি লেগেছে। এ পর্যন্ত ১৯ জন নিহত এবং ২৫০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।
‘কাঠমান্ডু পোস্ট’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী:
- আহতদের অধিকাংশ স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রী
- অন্তত ৭০ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক
- কাঠমান্ডুর বড় বড় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহতদের জন্য জরুরি বিভাগ চালু
ওলির পদত্যাগের দাবিতে তীব্র আন্দোলন
প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্র-যুবদের ক্ষোভ চরমে। বিরোধী দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) আনুষ্ঠানিকভাবে ওলির পদত্যাগ দাবি করেছে।
আরএসপির বিবৃতিতে বলা হয়েছে:
“প্রধানমন্ত্রী ওলি অবিলম্বে পদত্যাগ করুন। পুলিশের গুলিতে মৃত্যুর ঘটনায় দায়ীদের শাস্তির জন্য উচ্চপর্যায়ের বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখকের পদত্যাগ
বিক্ষোভের চাপের মুখে নেপালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখক পদত্যাগ করেছেন। সোমবার সন্ধ্যায় বালুওয়াতারে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে মন্ত্রিসভার বৈঠকে তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেন। সরকার এখন নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিয়োগের বিষয়ে আলোচনা করছে।
ওলির পৈতৃক বাড়িতে বিক্ষোভ ও হামলা
পূর্ব নেপালের কোশি প্রদেশের দামাক এলাকায় অবস্থিত ওলির পৈতৃক বাড়িও বিক্ষোভের নিশানায় পরিণত হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা ইট-পাথর ছুঁড়ে বাড়ির দেয়ালে আঘাত করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ সেখানে গুলি ছোঁড়ে। এলাকায় সেনা মোতায়েন করা হয়েছে।
দেশজুড়ে মহাসড়ক অবরোধ ও পরিবহন সংকট
বিক্ষোভকারীরা পূর্ব-পশ্চিম মহাসড়কসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো অবরোধ করেছে।
- টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ
- যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ
- পণ্য সরবরাহে ব্যাপক প্রভাব
- নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বেড়ে গেছে
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সেনা ও র্যাফ মাঠে নেমেছে।
‘জেন জেড’ প্রজন্মের নেতৃত্বে তরুণদের আন্দোলন
এই বিক্ষোভের নেতৃত্ব দিচ্ছে নেপালের ‘জেন জেড’ প্রজন্ম। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা সামনের সারিতে থেকে আন্দোলন চালাচ্ছে।
- কাঠমান্ডুর বিভিন্ন এলাকায় যুবকদের স্লোগান
- সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ
- সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধের সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি
কার্ফু জারি ও সেনা মোতায়েন
কাঠমান্ডুসহ নেপালের বিভিন্ন সংবেদনশীল এলাকায় কার্ফু জারি করা হয়েছে।
- পুলিশ ও সেনা যৌথভাবে পরিস্থিতি সামলাচ্ছে
- বিক্ষোভ দমনে সরাসরি গুলি চালানোর অভিযোগ
- আহতদের সহায়তায় ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প চালু
বিক্ষোভের নেপথ্যে গভীরতর অসন্তোষ
যদিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিষেধাজ্ঞা আন্দোলনের সূত্রপাত করেছে, বিশ্লেষকরা মনে করছেন এর নেপথ্যে আরও বড় কারণ রয়েছে:
- সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ
- আর্থিক বৈষম্য নিয়ে তীব্র ক্ষোভ
- ছাত্র-যুবদের মধ্যে বেকারত্ব সমস্যা
- বিরোধী কণ্ঠস্বর দমনের অভিযোগ
ওলির সরকারের দাবি, দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ন্ত্রণ জরুরি। কিন্তু বিক্ষোভকারীদের মতে, সরকারি সিদ্ধান্তের আসল উদ্দেশ্য বিরোধীদের কণ্ঠরোধ করা।
পরিস্থিতির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
বিশ্লেষকদের ধারণা, যদি সরকার দ্রুত সমাধানের পথ না খোঁজে, তাহলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হতে পারে।
- ওলির পদত্যাগ দাবি ক্রমশ জোরালো হচ্ছে
- সেনা ও পুলিশের ওপর চাপ বাড়ছে
- ইন্টারনেট বন্ধ থাকলেও টিকটক ও অন্যান্য অ্যাপ ব্যবহার করে আন্দোলনকারীরা সক্রিয়
সর্বশেষ আপডেট
- নিহত: ১৯ জন
- আহত: ২৫০ জনের বেশি
- স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ: নিশ্চিত
- সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিষেধাজ্ঞা এখনো বহাল
- সেনা ও র্যাফ মাঠে সক্রিয়


